বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা শ্লথ হওয়ার পাশাপাশি ইউরোপে বাড়তি প্রতিযোগিতার চাপে পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে দেশের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পোশাক রপ্তানি প্রায় ৪ শতাংশ কমে গেছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্কের কারণে চীন ও ভারত ইউরোপের বাজারে ঝুঁকছে, যা বাংলাদেশের জন্য মূল্যভিত্তিক প্রতিযোগিতা আরও কঠিন করে তুলেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে ইইউভুক্ত ২৭টি দেশে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.৯৮ শতাংশ কমেছে। এই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১.৩৪ বিলিয়ন ডলারে, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে তা ছিল ১১.৮১ বিলিয়ন ডলার।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৈশ্বিকভাবে অ্যাপারেল পণ্যের ভোগ কমে যাওয়ায় ক্রয়াদেশের চাপ বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন প্রতিযোগী বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে উচ্চ ট্যারিফের মুখে চীন ও ভারত তুলনামূলক কম দামে ইউরোপের ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহে আগ্রাসী কৌশল নিয়েছে। এতে দরকষাকষিতে পিছিয়ে পড়ছেন বাংলাদেশের সরবরাহকারীরা।
ইউরোপের পোশাক আমদানির তথ্য সংরক্ষণকারী সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বলছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ইউরোপে পোশাক পণ্যের মোট আমদানি প্রায় ৭ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ বাজার বড় হলেও প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় সেই সুফল পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, বৈশ্বিকভাবে পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়াই এই খাতের বড় সমস্যা। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে তুলনামূলক বেশি শুল্ক থাকায় চীন ও ভারত ইউরোপের বাজারে কম দামে অর্ডার নিয়ে দরকষাকষি করছে। এতে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, ক্রেতারা মূলত কম দামের দিকেই ঝুঁকেন। ফলে যেখানে সস্তায় পণ্য পাওয়া যায়, সেখান থেকেই তারা অর্ডার দেন। এই বাস্তবতাই ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করেছে।
ইউরোপ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য। মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই যায় ইইউভুক্ত ২৭টি দেশে। যুক্তরাজ্য যুক্ত হলে এই অংশ প্রায় ৬০ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে এই বড় বাজারেই এখন মিশ্র চিত্র দেখা যাচ্ছে।
একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পর সবচেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি হয় জার্মানিতে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, গত সাত মাসে জার্মানিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে ফ্রান্স, ডেনমার্ক, ইতালি ও সুইডেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারেও রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে। তবে সব বাজারে একই ধারা নেই। একই সময়ে স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও পোল্যান্ডের মতো কয়েকটি বড় ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে একক বাজার হিসেবে রপ্তানি সামান্য কমলেও কানাডা ও যুক্তরাজ্যের মতো বাজারে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
অপ্রচলিত বা নন-ট্র্যাডিশনাল বাজারগুলোতেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। গত সাত মাসে এসব বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২.৪৩ শতাংশ কমেছে। আলোচ্য সময়ে মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২২.৯৮ বিলিয়ন ডলার।
ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কাও কম নয়। শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে ভারত শুল্কমুক্ত সুবিধায় ইউরোপে পোশাক রপ্তানি করতে পারবে। এতে আগামী দিনে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

