চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের কয়েক একর মূল্যবান সম্পত্তি বিনা দরপত্রে ইজারা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত ছয় মাসে অন্তত ২৪ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এসব জায়গা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এসব সম্পত্তির বাজারমূল্য আনুমানিক শতকোটি টাকা। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, জায়গাগুলো কেবল ছয় মাসের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, পতেঙ্গা এলাকায় শাহ মাজিদিয়া এন্টারপ্রাইজকে এক একর এবং কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্সকে এক একর জমি দেওয়া হয়। মাঝিরঘাটে এসএস ট্রেডিংকে ১৪ হাজার ৯৪০ বর্গফুট বা ৩৪ দশমিক ৩০ শতক জায়গা ইজারা দেওয়া হয়েছে। নগরের সুজা কাঠগড় মৌজার চাক্তাই এলাকায় ২৪ শতক বা ১০ হাজার ৪৫৫ বর্গফুট জমি খাতুনগঞ্জের মেসার্স পূবালী ট্রেডার্স ও মেসার্স রহমান ট্রেডিংকে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া মেসার্স পূবালী ট্রেডার্সের মালিক সুব্রত মহাজনের ভাই দেবব্রত মহাজনকে ৫ শতক জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আইকন লজিস্টিককে বারিক বিল্ডিং দাম্মাম ফিলিং স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় ১৬ শতক জমি বিনা দরপত্রে দেওয়া হয়েছে। তালিকায় আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে।
বন্দর এলাকার ইসান মিস্ত্রির হাটে ১৫ জনকে কোনো দরপত্র ছাড়াই সরকারি জমি দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়েছে। নথি অনুযায়ী, মো. ছাদেককে ১২০ বর্গফুট, হারুনুর রশিদকে ৯১৮ বর্গফুট এবং ছকিনা বেগমকে ১২০ বর্গফুট করে মোট ৩৬০ বর্গফুট জমি দেওয়া হয়। এ ছাড়া মো. আলী পেয়েছেন ৩১৫ বর্গফুট। মনোয়ারা বেগম পেয়েছেন ২৯৮ বর্গফুট। আবুল কালামকে দেওয়া হয়েছে ১০০১ বর্গফুট। মো. হাসেম উদ্দিন পেয়েছেন ৭৪০ বর্গফুট। তাজ উদ্দিনকে ৮২৫ বর্গফুট। নজির আহাম্মদকে ৬০০ বর্গফুট। ছালা উদ্দিনকে ২৮০ বর্গফুট। নুরুল আলমকে ১২০ বর্গফুট এবং মোস্তফা কামালকে ১৪৭ বর্গফুট জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি বদলি হওয়া বন্দরের সদস্য প্রশাসন ও পরিকল্পনা অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমান বলেন, দরপত্র ছাড়া এভাবে বন্দরের জমি দেওয়া অন্যায়। তিনি জানান, লোভ ও অনৈতিক প্রভাবের কারণে কিছু অসাধু কর্মকর্তা অনিয়ম করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বন্দরের ভূমি শাখার কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বলেন, ওপরের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁরা কেবল বরাদ্দ কার্যক্রম সম্পন্ন করেছেন।
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে বন্দরের চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে বন্দরের পরিচালক প্রশাসন ওমর ফারুক বিনা দরপত্রে কিছু জমি দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, এসব জমি ছয় মাসের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে বন্দর কর্তৃপক্ষ তা ফেরত নেবে।
বন্দর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ সেপ্টেম্বর খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী মেসার্স পূবালী ট্রেডার্সের মালিক সুব্রত মহাজন এবং মেসার্স রহমান ট্রেডিংয়ের মালিক মোস্তাফিজুর রহমান জায়গা বরাদ্দের জন্য আবেদন করেন। ৭ অক্টোবর অস্থায়ীভাবে এবং পরে ছয় মাসের জন্য জায়গাটি বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর আগে ২৯ সেপ্টেম্বর বন্দরের ১৯৬৭০ নম্বর বোর্ড সভায় কোনো দরপত্র ছাড়াই এই দুই ব্যবসায়ীকে জায়গা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৯ অক্টোবর তাদের কাছে জায়গার দখল হস্তান্তর করা হয়।
বন্দরের ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ১৯৯৮–এর ৬ নম্বর বিধিতে বলা আছে, দরপত্র ছাড়া কোনো ভূমি ইজারা বা ভাড়া দেওয়া যাবে না। তবে আমদানি ও রপ্তানি পণ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনে ছয় মাসের জন্য ভাড়া দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
পূবালী ট্রেডার্সের মালিক সুব্রত মহাজন বলেন, তিনি বন্দর থেকে জায়গাটি বরাদ্দ পেয়েছেন। তাঁর অংশ ইতিমধ্যে রহমান ট্রেডিংয়ের মালিক মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। মোস্তাফিজুর রহমানও জায়গাটি কেনার বিষয়টি স্বীকার করেন। যদিও ভাড়ার শর্ত অনুযায়ী এই জমি হস্তান্তর করার সুযোগ নেই।
বন্দরের নথি বলছে, গত বছরের ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর মাঝিরঘাটের এসএস ট্রেডিং ১৪ হাজার ৯৪০ বর্গফুট বা ৩৪ দশমিক ৩০ শতক জমি ইজারার জন্য আবেদন করে। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি তারা বরাদ্দপত্র পায়।
এর আগে ২০২৪ সালের ৯ এপ্রিল বোর্ড সভার সিদ্ধান্তে নিয়ম উপেক্ষা করে দরপত্র ছাড়াই বেসরকারি অফডক ইনকনট্রেড লিমিটেডকে ৮ একর জমি ইজারা দেওয়া হয়েছিল। পরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় সেই ইজারা বাতিল করা হয়।

