দেশের অর্থনীতির মানচিত্রে পায়রা বন্দরের অবস্থান এখন দৃশ্যমান ও গুরুত্বপূর্ণ। ‘তৃতীয় করিডর’ নামে পরিচিত এই বন্দর ২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট প্রথম পণ্যবাহী জাহাজ ভেড়ানোর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে। এরপর ধাপে ধাপে সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত এই বন্দর থেকে সরকারের কোষাগারে জমা পড়েছে এক হাজার ৮৩৬ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব। সংখ্যাটি সাফল্যের ইঙ্গিত দেয়। তবে উজ্জ্বল এই চিত্রের আড়ালে জমে আছে ৬৫২ কোটি টাকার বেশি বকেয়া লেভি। বন্দর ব্যবহারের বিনিময়ে আদায় করা এই অর্থ দিয়েই পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নকাজ চলে। ফলে রাজস্ব প্রবাহ ঠিক থাকলেও লেভি বকেয়া বন্দরের আর্থিক সক্ষমতায় চাপ তৈরি করছে।
কাগজে অগ্রগতি, হিসাব খাতায় চাপ:
বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্র ও অভ্যন্তরীণ নথি বলছে, বড় অংশের বকেয়া এসেছে বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান, শিপিং এজেন্ট এবং পণ্য খালাসে যুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লেভি পরিশোধ না হলেও অনেক ক্ষেত্রে পণ্য খালাসের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
কোথাও বিল নিয়ে আপত্তি, কোথাও পুনর্নির্ধারণ বা প্রশাসনিক জটিলতার অজুহাতে অর্থ আটকে আছে মাসের পর মাস। শুরুতে আমদানি কার্যক্রম সচল রাখাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। সেই সময় কিছু শিথিলতা দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, ওই ছাড়ই এখন বড় অঙ্কের বকেয়ার বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কয়লা, সার, খাদ্যশস্য, পাথর ও ক্লিংকার আমদানিতে যুক্ত কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে সবচেয়ে বেশি বকেয়া রয়েছে। পণ্য খালাস শেষ হলেও বিল পরিশোধ হয়নি দীর্ঘদিন। শিপিং এজেন্ট ও চার্টারারদের একটি অংশের বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। জাহাজ চলে গেলেও হিসাব মেটেনি—এমন নজিরও আছে।
রাবনাবাদ চ্যানেলে মাদার ভেসেল থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য স্থানান্তরে যুক্ত কিছু লাইটারিং ও হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠানও বকেয়ার তালিকায় রয়েছে। নিয়মিত চার্জ পরিশোধ না করলেও প্রাথমিক পর্যায়ে কঠোরতা দেখানো হয়নি।
সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হলো সরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বকেয়া। একাধিক সূত্র জানায়, কিছু সরকারি সংস্থার আমদানি করা পণ্যের লেভি দীর্ঘদিন পরিশোধ হয়নি। ‘রাষ্ট্রীয় স্বার্থ’ বা ‘নীতিগত সিদ্ধান্ত’-এর যুক্তিতে আদায়ে কঠোরতা দেখানো হয়নি। এতে বেসরকারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সমতা বজায় ছিল কি না, সে প্রশ্ন উঠেছে।
এত বড় অঙ্কের বকেয়া থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তালিকা প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ। তাদের যুক্তি, অনেক বিষয় নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় রয়েছে। নির্দিষ্ট নাম প্রকাশ করলে মামলা বা চুক্তিগত জটিলতা বাড়তে পারে।
নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কোথাও সময়মতো বিল তোলা হয়নি, কোথাও ফলোআপ ছিল দুর্বল। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্ব ও লেভি আলাদা বিষয়। রাজস্ব যায় জাতীয় কোষাগারে। আর লেভি দিয়েই বন্দরের দৈনন্দিন কার্যক্রম ও অবকাঠামো উন্নয়ন চলে। এই অর্থ সময়মতো না এলে স্বনির্ভরতা বাধাগ্রস্ত হয়।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, লেভি আদায়ে শিথিলতা ভবিষ্যৎ বিনিয়োগকে ঝুঁকিতে ফেলে। এখনই কঠোর অবস্থান না নিলে বকেয়ার অঙ্ক আরও বাড়বে।
বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাসুদ ইকবালের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি। তাঁর একান্ত সচিব মু. আহসান হাবীবও পরে জানাবেন বলে জানান। পরিচালকের (অর্থ) অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মো. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়ার সঙ্গেও যোগাযোগ করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে উপপরিচালক (ট্রাফিক) আজিজুর রহমান বলেন, বকেয়া আদায়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ধাপে ধাপে নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। নতুন টার্মিনাল চালুর আগেই বড় অংশ আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৬৫২ কোটি টাকার বকেয়া রয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন। তবে বিস্তারিত জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। রাজস্বে সাফল্যের পরও লেভি বকেয়া এখন পায়রা বন্দরের আর্থিক ব্যবস্থাপনার বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।

