নির্বাচনের ঠিক আগে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা দেশের বাণিজ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে ধরা হচ্ছে। তবে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশ্বজুড়ে পাল্টা শুল্ক আরোপের পদক্ষেপ বাতিল করার পর, এই চুক্তি কার্যকর হলেও ঢাকার জন্য কোনো সরাসরি পাল্টা শুল্কের প্রভাব থাকবে না।
এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি এস পল কাপুর তিন দিনের সফরে ঢাকা আসছেন। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। রাষ্ট্রদূত এ সময় জানান, মার্চের প্রথম সপ্তাহে পল কাপুর বাংলাদেশ সফর করবেন।
জানা গেছে, পল কাপুর আগামী মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকায় পৌঁছাবেন। পরদিন তিনি ব্যবসায়ী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। রাতে রাষ্ট্রদূতের আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নেবেন। ৫ মার্চ তিনি একাধিক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করবেন এবং সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত ইফতার ও নৈশভোজে অংশ নেবেন। ৬ মার্চ ভোরে তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়বেন। তিন দিনের সফরে পল কাপুর বাণিজ্য, জ্বালানি, শ্রম ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করবেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতেরও সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হবে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে। রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের নৈশভোজে ব্যবসায়ীদের উপস্থিতিও বেশি হবে। ওয়াশিংটনের সূত্রের খবর, সরকারের সঙ্গে শুল্ক ও বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ব্যবসায়ীরা প্রায়শই অজুহাত দেখায়। তাই এবার পল কাপুরের সফরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক অগ্রাধিকার পাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে Agreement on Reciprocal Trade (ART), মার্কিন বাণিজ্য নীতি এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে। এরপর সরকারী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমান সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির অন্যতম মধ্যস্থতাকারী ছিলেন। তবে তিনি উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা চুক্তি ভারসাম্যহীন ছিল এবং বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হয়নি। বিশেষ করে চুক্তিতে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্টে সরাসরি চীনের নাম উল্লেখ ছিল। সামরিক ক্রয়ে চীনের সঙ্গে সীমাবদ্ধতা ছিল, কিন্তু চুক্তিটি আরও বিস্তৃত হওয়ায় এখন মার্কিন পক্ষের অনুমোদন ছাড়া অন্য দেশের কাছ থেকে ক্রয় করতে গেলে বাধার সম্মুখীন হতে হবে।
কূটনীতিকরা বলছেন, নির্বাচনের তিন দিন আগে চুক্তি করা তাড়াহুড়া ছিল। দরকষাকষিতে বাংলাদেশ কোনো শর্ত রাখতে পারেনি। চুক্তির ধারাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সর্বোচ্চ প্রাধান্য পেয়েছে, আর বাংলাদেশের অর্থনীতি বা বাণিজ্যিক বাস্তবতা গুরুত্ব পায়নি। উদাহরণ হিসেবে ‘ধারা ৪-এর অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা’ উল্লেখ করা যায়। এখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যদি এমন কোনো দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা করে, যার বাজারমূল্যের চেয়ে কমে পণ্য বিক্রি হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নিতে পারবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, বাংলাদেশ তা মেনে চলবে এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করতে বাধ্য হবে।
পরবর্তীতে চুক্তি বাংলাদেশের বাজার, রপ্তানি ও বাণিজ্যিক স্বাধীনতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কূটনীতিকরা মনে করেন, এই চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঢাকার সতর্ক ও কৌশলগত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
চুক্তি থেকে বের হওয়া ঢাকার জন্য সহজ নয়:
বাংলাদেশের জন্য পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি থেকে বের হওয়া সহজ হবে না। মার্কিন আদালত যেভাবে আগের পাল্টা শুল্ক বাতিল করেছে, তার জবাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নতুন করে ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করেছেন। এর ফলে আগের ১৫ শতাংশ শুল্কের পাশাপাশি বাংলাদেশকে ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্কের স্থলে ১০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। তবে আদালতের রায় সরাসরি Agreement on Reciprocal Trade (ART) চুক্তির ওপর প্রভাব ফেলবে না।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের করা বাণিজ্য চুক্তি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “বর্তমানে চুক্তি ও পাল্টা শুল্ক নিয়ে কিছু বলা প্রাসঙ্গিক নয়। পর্যালোচনার পর করণীয় নির্ধারণ করা হবে।”
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, আদালতের রায়ের পরও চুক্তি থেকে বের হওয়া সহজ নয়। মার্কিন বাণিজ্য দপ্তর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, বিচারাধীন থাকার পরও অংশীদাররা আলোচনা চালিয়ে গেছে এবং চুক্তি কার্যকর থাকবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমস্ত বাণিজ্য চুক্তি প্রযোজ্য থাকবে বলে তারা আত্মবিশ্বাসী।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, চুক্তির দরকষাকষিতে বাংলাদেশের অদক্ষতা স্পষ্ট। দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার বাইরে গিয়ে চুক্তি করা হয়েছে। এ চুক্তির বদলে যুক্তরাষ্ট্রের ডিএফসি ফান্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশে বিনিয়োগ আনা যেত এবং বিনিয়োগের কাঁচামাল যুক্তরাষ্ট্র থেকে এনে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো যেত। চুক্তির ফলে বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকারও ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ এম মাসরুর রিয়াজ মন্তব্য করেছেন, “এই চুক্তি যতটা বাণিজ্যিক, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। মার্কিন আদালত শুধু পাল্টা শুল্ক নিয়ে রায় দিয়েছে। তাই বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে চুক্তি মেনে চলার।”
চুক্তি থেকে বের হতে চাইলে রাজনৈতিকভাবে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, “আদালতের রায়ের পর চাইলে ঢাকা চুক্তি থেকে বের হতে পারে। তবে তা ওয়াশিংটনের কাছে ইতিবাচকভাবে দেখা হবে না। শুল্ক আরোপ না থাকলেও রাজনৈতিকভাবে ওয়াশিংটন মোকাবিলা করার ক্ষমতা নেই। তাই কিছু বিতর্কিত শর্ত নিয়ে নতুন দরকষাকষির অনুরোধ করা হতে পারে।”

