বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে আরও শক্তিশালী হয়েছে। ২০২৫ সালে দেশের বাজার অংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২১.৫৭ শতাংশে পৌঁছেছে। এই বৃদ্ধি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্যানুসারে, ২০২১ সালে বাংলাদেশের বাজার অংশ ছিল ১৯.৭৮ শতাংশ। ২০২২ সালে এটি বেড়ে ২২.০৬ শতাংশে দাঁড়ায়, যা তখনকার সর্বোচ্চ। ২০২৩ সালে সামান্য হ্রাসে অংশ কমে ২০.৬৭ শতাংশ হলেও, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে যথাক্রমে ২০.৭৮ শতাংশ এবং ২১.৫৭ শতাংশে পৌঁছেছে। ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানি ২০২৫ সালে ৫.৯৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৯.৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালে এই পরিমাণ ছিল ১৮.৩১ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা বলছেন, ইইউর ক্রেতারা এখন শুধু বুনন করা তুলার পোশাকই চাইছেন না। তারা বৈচিত্র্যময় ও প্রযুক্তিনির্ভর পোশাকের চাহিদাও বাড়াচ্ছেন। বাংলাদেশের তৈরি কৃত্রিম তন্তু পণ্যের উৎপাদন যদি আরও শক্তিশালী হয়, তবে ভবিষ্যতে দেশটি চীনের কাছাকাছি অবস্থান নিতে সক্ষম হতে পারে, মন্তব্য করেছেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় বাজারে সর্বোচ্চ অংশ ধরে রেখেছে চীন। ২০২১ সালে চীনের বাজার অংশ ছিল ৩০.২৮ শতাংশ। সামান্য পতনের পর ২০২৩ সালে এটি কমে ২৭.৮৫ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে ২০২৫ সালে চীনের বাজার অংশ পুনরায় বেড়ে ২৯.৫৪ শতাংশে উঠেছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প ইউরোপীয় বাজারে স্থিতিশীল অবস্থান ধরে রেখে নতুন প্রযুক্তি ও বৈচিত্র্যময় পণ্যের দিকে মনোযোগ বাড়ালে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ইইউর বাজারে দ্বিতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ২০২৫ সালে দেশের বাজার অংশ বেড়ে ২১.৫৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে তুরস্কের অংশ ছিল মাত্র ৯.২৭ শতাংশ, ভারতের ৫.০৩ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ৪.৯৯ শতাংশ। এই তথ্য বাংলাদেশের রপ্তানিতে সাফল্যকে আরও স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মাদ হাতেম বলেন, “বাংলাদেশের বাজার অংশের স্থায়িত্ব ও পুনরুদ্ধার প্রমাণ করে, ইইউর ক্রেতারা আমাদের দেশকে শুধু কম খরচের হিসেবে দেখছে না। পণ্যের গুণগত মান, সময়মতো ডেলিভারি এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থাকে তারা গুরুত্ব দিচ্ছে।” তিনি আরও জানান, যদিও কিছু ওঠানামা দেখা গেছে, তবে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের বাজার অংশ সামগ্রিকভাবে উন্নতির দিকে ছিল।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মন্তব্য করেছেন, “ইইউর ক্রেতারা এখন শুধু বুনন করা তুলার পোশাক চাইছে না। বৈচিত্র্যময় ও প্রযুক্তিনির্ভর পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশে কৃত্রিম তন্তু পণ্যের উৎপাদনের ভিত্তি যদি আরও শক্তিশালী হয়, তবে ভবিষ্যতে চীনের কাছাকাছি অবস্থান নেওয়া সম্ভব।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জন করেছে। সাস্টেইনেবিলিটি সার্টিফিকেশন, ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট এবং কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানোর উদ্যোগ ইইউর পরিবেশ-সংবেদনশীল ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। এই সুবিধা ভবিষ্যতে দেশের বাজার অংশ আরও সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
বস্ত্রখাতের ব্যবসায়ীরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তাদের মতে, যদি বাংলাদেশের পণ্যবৈচিত্র্য, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ, ডিজাইন এবং প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, আগামী পাঁচ বছরে দেশের বাজার অংশ ২৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর বাজার অংশ বাংলাদেশের তুলনায় কমেছে। তুরস্কের অংশ হ্রাস পেয়েছে উচ্চ শ্রমিক খরচ এবং ইউরোপের পরিবর্তিত চাহিদার কারণে, যেখানে বাংলাদেশ দ্রুত সময়মতো ডেলিভারি এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্য দিয়ে সুবিধা ধরে রেখেছে। ভারতের বাজার অংশ কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত ইউরোপীয় বাজারে ক্রমবর্ধমান অবস্থান ধরে রেখে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

