মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ঘিরে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, চার বছর আগে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এটি বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালিতে। এই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
জাহাজ চলাচল-সংক্রান্ত তথ্য বলছে, অন্তত ১১টি বড় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী ট্যাংকার যাত্রা স্থগিত করেছে। জাপানের জাহাজ পরিবহন কোম্পানি নিপ্পন ইউসেন এবং মিতসুই ওএসকে লাইনস তাদের জাহাজগুলোকে নিরাপদ জলসীমায় অপেক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছে। এতে সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
এশিয়ার দেশগুলোকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে দেখা হচ্ছে। কাতার থেকে জ্বালানি আমদানিতে শীর্ষে থাকা চীন, ভারত ও জাপানের আমদানিকারকরা এখন বিকল্প সরবরাহের খোঁজে তৎপর। তবে বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ আগেই সীমিত ছিল। নতুন এই উত্তেজনা স্পট মার্কেটে দামের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, এতে গত এক বছরের মূল্যস্থিতি ভেঙে পড়তে পারে।
শুধু তা-ই নয়, দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তির মূল্য সাধারণত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। ফলে তেলের দাম বাড়লে গ্যাসের চুক্তিমূল্যও বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে শিল্প উৎপাদন ও সাধারণ গ্রাহকের ব্যয়ে। পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে উৎপাদন পর্যায়ে। ট্যাংকার চলাচল বন্ধ থাকলে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্রগুলো পুরোপুরি বন্ধ করার ঝুঁকি তৈরি হয়। কারণ এসব স্থাপনায় কুলিং ইউনিট সচল রাখতে নিয়মিত রপ্তানি প্রয়োজন।
সংকট উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরেও প্রভাব ফেলছে। ইসরায়েল তাদের গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলন বন্ধ করেছে। তুরস্কে ইরানি পাইপলাইনের সরবরাহও অনিশ্চয়তায় রয়েছে। এতে মিসরের মতো দেশগুলোকে সমুদ্রপথে উচ্চমূল্যে গ্যাস কিনতে হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, বাজারে যে পরিমাণ গ্যাস অবশিষ্ট আছে তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী এক ধরনের ‘নিলাম যুদ্ধ’ শুরু হতে পারে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব কেবল জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বৈশ্বিক জীবনযাত্রার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যেতে পারে।

