বাংলাদেশে একসময় ডিজেলের প্রায় পুরো জোগানই আসত মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বিশেষ করে কুয়েত ছিল প্রধান উৎস। তবে গত দুই দশকে সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ ডিজেল সরবরাহে বড় ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি ভারত থেকেও আসছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আমদানি তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬–০৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) যে ডিজেল আমদানি করেছিল, তার ৯১ শতাংশই এসেছিল কুয়েত থেকে। একই সময়ে ভারতের অংশ ছিল মাত্র ৯ শতাংশ। অর্থাৎ তখন প্রায় পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর ছিল দেশের ডিজেল আমদানি।
তবে পরবর্তী এক দশকে এই চিত্র দ্রুত বদলাতে শুরু করে। ডিজেল সরবরাহকারীর তালিকায় দ্রুত ওপরে উঠে আসে সিঙ্গাপুর। একসময় দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারীতে পরিণত হয়। একই সময় মালয়েশিয়া, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবসহ আরও কয়েকটি দেশ আমদানির তালিকায় যুক্ত হয়। ফলে সরবরাহের উৎস ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে থাকে।
বর্তমানে ডিজেল আমদানির উৎস আরও বহুমুখী হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রায় ২৩ লাখ টন ডিজেল আমদানি করেছে। এর মধ্যে ৪১ শতাংশ এসেছে সিঙ্গাপুর থেকে এবং ২৪ শতাংশ মালয়েশিয়া থেকে। ফলে আগের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমে এসেছে।
দুই দশক আগে ডিজেল আমদানির বড় অংশই হতো সরকার–টু–সরকার বা জিটুজি চুক্তির মাধ্যমে। সে সময় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোই ছিল প্রধান সরবরাহকারী। পরে ধীরে ধীরে আমদানির একটি বড় অংশ প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে কেনা শুরু হয়। বর্তমানে প্রায় ৫০ শতাংশ ডিজেল এভাবে কেনা হয়। এতে সরবরাহকারীর সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি আমদানির উৎসও হয়েছে বৈচিত্র্যময়। উল্লেখ্য, ডিজেল এখনো সরকারি খাতেই আমদানি হয় এবং এ দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় ডিজেল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জ্বালানি। সড়ক পরিবহনের বড় অংশ—বাস, ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ড ভ্যান ও পণ্যবাহী যানবাহন—ডিজেলচালিত। কৃষি খাতে সেচযন্ত্র চালানো, নদীপথে ইঞ্জিনচালিত নৌযান পরিচালনা এবং বহু শিল্পকারখানায় জেনারেটর চালাতেও এই জ্বালানি ব্যবহার হয়। বিদ্যুৎ ঘাটতির সময় কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রেও ডিজেল ব্যবহার করা হয়। ফলে পরিবহন, কৃষি, শিল্প এবং বিদ্যুৎ—সব ক্ষেত্রেই ডিজেলের ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে। দেশে ব্যবহৃত মোট ডিজেলের প্রায় ২৪ শতাংশই খরচ হয় কৃষি খাতে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, এখন ডিজেল আমদানির উৎস অনেক বিস্তৃত হয়েছে। জিটুজি চুক্তির পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমেও কেনা হচ্ছে। ফলে সরবরাহে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা কমেছে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৩ শতাংশই আসে ডিজেল থেকে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ডিজেলের চাহিদা ছিল প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। এর বড় অংশ সরাসরি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। আর বছরে প্রায় সাত থেকে সাড়ে সাত লাখ টন ডিজেল পাওয়া যায় অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের মাধ্যমে।
আমদানির কত ভাগ আসে ভারত থেকে?
ডিজেল আমদানির উৎসে বড় পরিবর্তন এলেও ভারত থেকে আমদানির ধারা পুরোপুরি বদলায়নি। কখনো এর পরিমাণ কমেছে, আবার কখনো বেড়েছে। ফলে মোট আমদানিতে ভারতের অংশ বিভিন্ন সময়ে ওঠানামা করেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬–০৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে আমদানি করা মোট ডিজেলের ৯ শতাংশ এসেছিল ভারত থেকে। পরবর্তী কয়েক বছর এই অংশ এক অঙ্কেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা কখনো দুই অঙ্কের অংশীদারিতেও পৌঁছেছে।
গত পাঁচ বছরে ভারতের অংশ সবচেয়ে বেশি ছিল ২০২৩–২৪ অর্থবছরে। ওই বছর ভারত থেকে প্রায় ৫ লাখ ৫১ হাজার টন ডিজেল আমদানি করা হয়, যা মোট আমদানির প্রায় ১৫ শতাংশ। এরপর কিছুটা কমে আসে আমদানির পরিমাণ। গত অর্থবছরে ভারত থেকে প্রায় ৪ লাখ ৪৮ হাজার টন ডিজেল এসেছে। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমদানি হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৩৩ হাজার টন।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেল থেকে পূরণ হয়। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ডিজেলের চাহিদা ছিল প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। এর বড় অংশ সরাসরি আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়।
ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটেডসহ কয়েকটি কোম্পানি বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহ করে থাকে। দুই দেশের মধ্যে ডিজেল সরবরাহ সহজ করতে নির্মাণ করা হয়েছে বাংলাদেশ–ভারত মৈত্রী পাইপলাইন। প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন ভারতীয় অর্থায়নে নির্মিত এবং ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে চালু হয়।
এই পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে ডিজেল সরাসরি দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোতে পৌঁছে যায়। পাইপলাইনে তেল পাঠানোর দুই দিনের মধ্যেই বাংলাদেশে চালান পৌঁছানো সম্ভব হয়। সম্প্রতি এই পাইপলাইনের মাধ্যমে পাঁচ হাজার টন ডিজেলের একটি চালান বাংলাদেশে এসেছে। চুক্তি অনুযায়ী বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল এভাবে আমদানি করা সম্ভব।
ডিজেল আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় হওয়ায় সরবরাহ ঝুঁকি অনেকটাই কমেছে। আগে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা বেশি থাকায় আন্তর্জাতিক অস্থিরতা দেখা দিলে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকত। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের উত্তেজনা বা সংকট দেখা দিলে দেশের জ্বালানি আমদানিতে প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতো।
এখন সেই পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। বাংলাদেশ বর্তমানে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীন, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতসহ একাধিক দেশ থেকে ডিজেল আমদানি করছে। ফলে কোনো একটি অঞ্চল বা দেশের সরবরাহে সমস্যা তৈরি হলেও বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আনার সুযোগ থাকছে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বেড়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, এখন ডিজেল আমদানির উৎস অনেক বিস্তৃত। সরকার–টু–সরকার (জিটুজি) চুক্তির পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমেও ডিজেল কেনা হচ্ছে। এর ফলে সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কমেছে। একই সঙ্গে ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সহজেই ডিজেল আনা সম্ভব হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, জ্বালানি আমদানির উৎস আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা ব্রুনেই থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টন তেল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করছি। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকেও তেল আমদানির সুযোগ রয়েছে। এতে আমদানির উৎসে আরও বৈচিত্র্য আসবে।’

