আধুনিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকারকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে পেশাজীবী হিসেবে আইনজীবীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীনকাল থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনায় আইনজ্ঞ ও আইনজীবীদের সক্রিয় উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
আইনজীবীরা শপথবদ্ধ হয়ে সংবিধান, মৌলিক মানবাধিকার এবং উচ্চ নৈতিকতা রক্ষা করে থাকেন। তাদের একটি নিজস্ব আচরণবিধি রয়েছে, যা পেশাজীবী হিসেবে ডাক্তার ছাড়া খুব কম পেশায় দেখা যায়। পাশাপাশি, আইনজীবীরা আদালতের ‘অফিসার অব দ্য কোর্ট’ হিসেবে ন্যায়বিচারে সহায়তা প্রদান করেন।
আইনজীবীরা কেবল পেশাগতভাবে নয়, সামাজিকভাবে ও নাগরিক সমাজের অগ্রগামী সদস্য হিসেবেও বিবেচিত হন। তারা সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে থাকেন। এছাড়া, বার কাউন্সিল ও বার এসোসিয়েশনের মাধ্যমে তারা সাংগঠনিক দক্ষতা অর্জন করেন, যা খুব কম পেশাজীবীর ক্ষেত্রে দেখা যায়। এই কারণে সামাজিক আইনবিজ্ঞানের পণ্ডিত রসকো পাউন্ড আইনজীবীদের ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসও আইনজীবীদের উজ্জ্বল অবদান নিয়ে ভরপুর। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনে তারা আদালত ও রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ৮০-এর দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আইনজীবীদের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। এতসব ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতার কারণে সাধারণ জনগণ, অন্যান্য পেশার মানুষ এবং তরুণ আইনজীবীরা এই পেশার প্রতি অনেক প্রত্যাশা রাখেন।
বার কাউন্সিল ও বার এসোসিয়েশনগুলো এই দিক থেকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মডেল হতে পারে। কারণ আইনজীবীরা সংবিধান ও আইন জানেন, প্রয়োগ করার ক্ষমতা রাখেন এবং জনগণের অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করার সুযোগ পান। পাশাপাশি, তাদের কাজের পরিবেশ গণতান্ত্রিক আচরণের মূল গুণাবলী যেমন যুক্তিশীলতা, সহনশীলতা, সমবেদনা এবং অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার চর্চার সুযোগ দেয়। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেও তারা গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন।
তবে এত সুবিধা ও সুযোগ থাকা সত্বেও আইনজীবীরা কি নিজেদের পেশার প্রতি সুবিচার করতে পারছেন? গত ৫–৭ বছরে এই প্রশ্ন ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর, যখন সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা আকাশচুম্বী, তখন কিছু আইনজীবীর আচরণিক দুর্বলতা লক্ষ্য করা যায়। এতে বিজ্ঞ আইনজীবী সমাজ ও সাধারণ জনগণ স্তম্ভিত হন। এই বিষয়গুলো স্থানীয় ও জাতীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশিত হচ্ছে, যা আইনজীবী সমাজ ও আদালতের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। অভিজ্ঞ সিনিয়ররা মনে করছেন, এর আগে কখনো এমন অবস্থা দেখা যায়নি।
এ সমায়কালে নিচের প্রবণতাগুলো বেশি পরিলক্ষিত হয়: সম্প্রতি দেশে কিছু বার ও আইনজীবী সমাজে সমস্যার ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে, যা বিচার ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও আইনের প্রতি জনমনের আস্থা ক্ষুণ্ন করছে। প্রধান সমস্যাগুলো হলো:
- কতিপয় বিজ্ঞ আইনজীবী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ কয়েকটি বারে কিছু আসমীর উপর আক্রমণ করেছেন।
- কিছু বারে বিরোধী রাজনৈতিক সমর্থক বিজ্ঞ আইনজীবীদের ওপর হামলা চালানো, চেম্বার ভাঙচুর করা, মামলা পরিচালনায় বাধা দেওয়া এবং হয়রানিমূলক মামলা রুজু করা হয়েছে।
- কিছু বারে নিয়মিত নির্বাচন না করে এডহক কমিটির মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়, যা কেউ কেউ ‘বার দখল’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
- বিরোধী রাজনৈতিক সমর্থক বিজ্ঞ আইনজীবীদের নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া ও একতরফা নির্বাচন করানো।
- কিছু বারে বিচারককে প্রভাবিত করা, হুমকি দেওয়া ও বদলিতে প্রভাব ফেলা, যার ফলে বার ও বেঞ্চের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই ঘটনার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি রোধে বার কাউন্সিল, বার এসোসিয়েশন বা বিচার প্রশাসন থেকে তেমন কোনো উদ্যোগও দেখা যায়নি। ফলে সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা ক্রমশ বেড়ে চলেছে:
- এসব ঘটনা প্রতিহিংসার উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
- বিচার বিভাগের, বিশেষ করে বিজ্ঞ আইনজীবী সমাজের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
- বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে এটি অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আমরা মনে রাখতে হবে, বিচার বিভাগের ইতিমধ্যে দুটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে:
১) বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা ও মামলা জট এবং
২) দুর্নীতি ও অনিয়ম, যা টিআইবি সহ বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
এর ফলে অনেক বিচারপ্রার্থী আদালতে আসতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও আদালত এখনও অনেকক্ষেত্রে ‘বিচারপ্রার্থী-বান্ধব’ হয়নি। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক আইনজীবী সংঘর্ষের প্রবণতাগুলো যুক্ত হলে, আইনজীবী সমাজের ভবিষ্যত কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে, তা সহজে অনুমান করা যায়। বস্তুনিষ্ঠভাবে বলা যায়, বিচার প্রশাসনের প্রধান স্টেকহোল্ডার—বিজ্ঞ বিচারক, বিজ্ঞ আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী কারো পক্ষেই এই পরিস্থিতি কাম্য নয়। তাই সমস্যার কারণ বিশ্লেষণ করা এবং যথাযথ সমাধান করা এখন সময়ের দাবি।
আইনজীবী সমাজে সমস্যার মূল কারণ: গভীর পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বার ও আইনজীবী সমাজে চলমান সমস্যা মূলত কয়েকটি কারণের সঙ্গে জড়িত:
- দলীয় রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব: এক দল অন্য দলকে সহ্য করতে পারছে না। আইনপেশার সিনিয়রদের মান্যগণ্য রীতি অনেকাংশে ক্ষীণ হয়ে গেছে।
- নির্বাচনের চাপ ও ব্যয়: বার এসোসিয়েশনে ঘন ঘন নির্বাচন হয়। অনেক বিজ্ঞ সদস্য নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ব্যয় ও বিনিয়োগ করেন। কারো কারো কাছে পদবী লাভজনক মনে হয়। জিততে হবে এমন মনোভাব থেকে উগ্রতা সৃষ্টি হয় এবং কেউ কেউ নির্বাচন প্রভাবিত করতে চেষ্টা করেন।
- বার কাউন্সিলের দুর্বলতা: অভিভাবক সংগঠন হিসেবে বার কাউন্সিল এই সমস্যা সমাধানে তেমন কার্যকর ভূমিকা নিতে পারছে না।
- শপথ ও আচরণবিধি অজানা বা অবহেলা: কিছু বিজ্ঞ আইনজীবী শপথ ও আচরণবিধি জানেন না বা মানেন না।
- নির্বাচিত কমিটি ও নেতৃবৃন্দের সীমাবদ্ধতা: বার এসোসিয়েশনের কমিটিগুলো উদ্ভূত সমস্যার প্রতিরোধ ও প্রতিকার কার্যকরভাবে করতে পারছে না।
- সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগত পুনর্গঠন: বার কাউন্সিল ও বার এসোসিয়েশন নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে গতিশীল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারছে না। এজন্য সমষ্টিগতভাবে আইনজীবী সমাজের দায়িত্ব রয়েছে।
- অসামর্থ্য থেকে মুক্তির প্রয়োজনীয়তা: বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সঙ্গে পেশার সুনাম, অস্তিত্ব এবং বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার জড়িত। সুতরাং এই চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
এই কারণগুলো মিলিয়ে দেখা গেলে বোঝা যায়, আইনজীবী সমাজের স্থিতিশীলতা ও সুনাম রক্ষার জন্য সমন্বিত ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।
সংকট উত্তরণে প্রস্তাবিত পথ ও করণীয়
আইনজীবী সমাজের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায়, স্বল্প অভিজ্ঞতা ও সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে কয়েকটি সম্ভাব্য সমাধান সামনে এসেছে। এগুলো মূলত পেশার মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বিচারপ্রার্থীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রথমত, বার কাউন্সিল, বার এসোসিয়েশন এবং আইনজীবীদের পেশাগত উদ্দেশ্য নতুনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। আইনজীবীদের উন্নয়নের পাশাপাশি ‘অফিসার অব দ্য কোর্ট’ হিসেবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে আদালতকে আরও বিচারপ্রার্থী-বান্ধব করে তুলতে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বার সংগঠনগুলোকে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বার কার্যক্রমকে রাজনীতিমুক্ত রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। এ লক্ষ্যে সিনিয়র আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টদের অংশগ্রহণে একটি সুস্পষ্ট আচরণবিধি প্রণয়ন করা যেতে পারে, যাতে পেশাগত পরিবেশ সুস্থ থাকে।
তৃতীয়ত, নির্বাচনী ব্যবস্থায় সংস্কার আনা জরুরি। বার কাউন্সিলের মতো নির্দিষ্ট সময় অন্তর নির্বাচন আয়োজন করা যেতে পারে। একই পদে দীর্ঘদিন অবস্থান নিরুৎসাহিত করার বিষয়টিও বিবেচনায় আনা যেতে পারে, যাতে নেতৃত্বে ভারসাম্য আসে।
চতুর্থত, নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আধুনিকায়ন করে অনলাইন বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রচারণা, ভোটগ্রহণ ও গণনা চালু করা যেতে পারে। এতে স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ বাড়বে।
পঞ্চমত, বিদ্যমান আচরণবিধিকে সময়োপযোগী করে পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন। সকল আইনজীবীর জন্য শপথ ও আচরণবিধি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে এবং এর ওপর কার্যকর নজরদারি জোরদার করতে হবে।
ষষ্ঠত, বার কাউন্সিলকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। প্রতিটি বার থেকে সিনিয়র ও জুনিয়র সদস্যদের নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করে সমস্যা চিহ্নিত করা এবং কার্যকর কৌশল নির্ধারণ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে আইন ও বিধিমালায় সংশোধন আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
সপ্তমত, বার এসোসিয়েশনগুলো বছরে অন্তত দুইবার আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের নিয়ে গণশুনানির আয়োজন করতে পারে। এতে সংশ্লিষ্টদের সমস্যা ও সুপারিশ সরাসরি জানা সম্ভব হবে। পাশাপাশি প্রতিটি বারে অভিজ্ঞ সিনিয়র সদস্যদের নিয়ে উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যারা সমস্যা সমাধানে সহায়তা করবেন।
অষ্টমত, আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিচার দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে। আদালত প্রাঙ্গনে যেকোনো সহিংসতা, ভাঙচুর বা পেশা পরিচালনায় বাধাকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ভুক্তভোগীদের সহায়তায় বার কাউন্সিল ও বার এসোসিয়েশনকে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, সংবিধান, আইনের শাসন ও মানবাধিকার রক্ষার যে পেশাগত অঙ্গীকার আইনজীবীরা বহন করেন, তা বাস্তবায়নে নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া জরুরি। বার কাউন্সিল ও বার এসোসিয়েশনকে সময়োপযোগী করে গড়ে তুলতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ সিনিয়রদের মতামত ও সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আইনজীবী সমাজের এই অঙ্গীকার কেবল পেশার উন্নয়নেই নয়, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের পথেও উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। বিভ্রান্তি বা বিশৃঙ্খলার কাছে নতি স্বীকার না করে, সবাইকে শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে এনে আইনজীবী সমাজকে এগিয়ে যেতে হবে—এটাই সময়ের দাবি।
লেখক : রাম চন্দ্র দাশ; আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

