সম্প্রতি সংসদে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের মন্তব্য আইনি বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, “এই যে আদেশ (জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ), এটি না অধ্যাদেশ, না আইন। মাঝামাঝি জিনিস।”
এই বক্তব্যের পর আমি সংসদে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় আইন ও সংবিধানের সংজ্ঞা তুলে ধরি। সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির জারি করা আদেশ আইন হিসেবে গণ্য হয়।
এ প্রসঙ্গে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত রুহুল কুদ্দুস কাজল দৈনিক প্রথম আলোয় একটি কলামে লিখেছেন, “ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি আদেশ জারি করতে পারেন। সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে ‘আইন’-এর সংজ্ঞা অধ্যাদেশের পাশাপাশি আদেশকেও অন্তর্ভুক্ত করে। তবে এই ব্যাখ্যায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।”
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, “সংবিধান অনুযায়ী ‘আইন’ বলতে কোনো আইন, অধ্যাদেশ, আদেশ, বিধি, প্রবিধান বা উপ-আইন, বিজ্ঞপ্তি ইত্যাদি বোঝানো হয়েছে। তাই ‘আদেশ’ যে আইনের অন্তর্ভুক্ত, তা অস্বীকার করা যায় না।” বিতর্কের মূল প্রশ্ন এখন, বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোতে রাষ্ট্রপতি কি আদেশ জারি করতে পারেন? আইন বিশেষজ্ঞদের সরাসরি উত্তর—না।
একই বিষয়ে ডেভিড বার্গম্যান তার ফেসবুক স্ট্যাটাস-এ লিখেছেন, “নাজিবুর রহমান মূল বিষয়টি পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারছেন না। ‘আইন’ বা ‘আদেশ’ নাম থাকলেই সবকিছু আইন হয়ে যায় না। কোনো কিছু আইন হিসেবে গণ্য হতে হলে তা সংবিধান অনুযায়ী প্রক্রিয়া বা সংসদীয় আইনের অধীনে তৈরি হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, সংসদে পাস হওয়া একটি ‘Act’ তখনই আইন হিসেবে বিবেচিত হয়, যখন তা নির্ধারিত সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গৃহীত হয়। সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে স্বতন্ত্রভাবে ‘আদেশ’ জারি করার কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। সুতরাং, আদেশটি বৈধ আইনগত দলিল নয়।” এই মন্তব্যের সঙ্গে সংসদে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের বক্তব্যও যুক্ত। তিনি বলেন, “এই আদেশটি আইন নয়।”
বিষয়টি আরও জটিল করেছেন সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি লিখেছেন, সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির আদেশও আইন হিসেবে গণ্য হয়। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘আদেশ’ যে আইনের অন্তর্ভুক্ত তা অস্বীকার করা যায় না। তবে তিনি ঠিকই বলেছেন, মূল বিতর্ক হলো—রাষ্ট্রপতি কি বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে আদেশ জারি করতে পারেন?
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করাচ্ছেন, এখানে দুটি প্রশ্নকে মিশিয়ে দেখা হলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। একদিকে প্রশ্ন, ‘রাষ্ট্রপতির আদেশ কি সংবিধানের সংজ্ঞা অনুযায়ী আইন?’ অন্যদিকে প্রশ্ন, ‘রাষ্ট্রপতির এই আদেশ জারির এখতিয়ার আছে কি না?’—দুটি আলাদা বিষয়। বার্গম্যান একত্রে দুই বিষয় মিলিয়ে দিয়েছেন, যা বিতর্ককে আরও জটিল করেছে।
সংক্ষেপে, আদেশকে আইন হিসেবে গণ্য করা যায় সংবিধানের দৃষ্টিকোণ থেকে, কিন্তু রাষ্ট্রপতি কি এমন আদেশ জারি করতে পারেন—এই প্রশ্ন এখনও সমাধানহীন।
সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনের শাসনের একটি মৌলিক নীতি হলো—কোনো আইনের বৈধতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে সুপ্রিম কোর্ট। কোনো আইনকে কেউ ‘অসাংবিধানিক’ মনে করলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর হয় না। যতক্ষণ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট সেটিকে স্থগিত বা বাতিল ঘোষণা না করছে, ততক্ষণ এটি কার্যকর আইন হিসেবে বহাল থাকে। এই নীতিকে বলা হয় presumption of constitutionality—অর্থাৎ, প্রতিটি আইনকে আদালত বাতিল না করা পর্যন্ত সাংবিধানিক বলে ধরে নেওয়া হয়।
একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ আলোচনার সুযোগ দেয়। স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪-এর আলোকে বর্তমান সরকার ছয়টি সিটি কর্পোরেশনে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে কিন্তু এই অধ্যাদেশ রাষ্ট্রপতি তাঁর সাংবিধানিক এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে জারি করেছেন। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এমন কোনো অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন না, যা সংবিধানের কোনো বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—স্থানীয় সরকারের সকল প্রতিনিধি নির্বাচিত হতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ও আছে, যেখানে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছে (কুদরতে এলাহী পনির মামলা, ৪৪ ডি এল আর)। সুতরাং, ডেভিড বার্গম্যানের যুক্তি অনুযায়ী, এই অধ্যাদেশকে প্রকৃত অর্থে ‘আইন’ হিসেবে গণ্য করা যায় না।
এবার প্রশ্ন দাঁড়ায়—এই অধ্যাদেশের ভিত্তিতে যেসব মেয়রকে অপসারণ করা হয়েছে, তারা যদি দাবি করেন যে রাষ্ট্রপতির জারি করা অধ্যাদেশটি অসাংবিধানিক, তখন তাদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা কী হবে? আইনি উত্তর হলো: সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচিত সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আদালতে গিয়ে অধ্যাদেশটির ওপর স্থগিতাদেশ (stay order) প্রার্থনা করা বা এটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে রায় নেওয়া। ততক্ষণ পর্যন্ত অধ্যাদেশের অধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকরাই আইনগতভাবে বৈধ হিসেবে গণ্য হবেন।
এই প্রেক্ষিতে মূল আইনি প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রপতি কোনো আদেশ, বৈধ বা অবৈধ পদ্ধতিতে বানানো হোক না কেন, সেটিকে আদালতের মাধ্যমে বাতিল বা স্থগিত না করা পর্যন্ত কীভাবে অমান্য করা যায়? আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—যারা সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়েছেন, তারা কীভাবে এমন একটি আইনকে অমান্য করতে পারেন, যেটিকে সংবিধান নিজেই আইন হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে?
রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়ে চলমান বিতর্কে আইনি ও রাজনৈতিক স্তরে নানা মতামত এসেছে। সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত নবনিযুক্ত অ্যার্টনি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, “স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে প্রেসিডেন্টকে দেওয়া ক্ষমতাবলে তিনি এই আদেশ জারি করেছিলেন। সংবিধানের ৪র্থ তফসিল অনুযায়ী স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশে প্রণীত সংবিধানের অধীন গঠিত সংসদের প্রথম বৈঠকের পর এ ধরনের আদেশ জারির কোনো সুযোগ নেই।”
তবে যে বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেননি, তা হলো—স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রে রাষ্ট্রপতিকে এই ক্ষমতা কোথা থেকে দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, জনগণের সাংবিধানিক ক্ষমতা (constituent power) এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে এটি প্রদান করা হয়েছিল। সংবিধানের ৭(২) অনুচ্ছেদেও বলা হয়েছে, “জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি হিসেবে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন।” অর্থাৎ সাংবিধানিক ক্ষমতা মূলত জনগণের হাতে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধান প্রণয়নের পর এই ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয় না। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত ১৩তম সংশোধনী মামলায় স্পষ্ট করে বলেছেন, জনগণের constituent power সর্বদা বিদ্যমান থাকে এবং পুনরায় সক্রিয় হতে পারে। আদালত সংবিধানকে একটি ‘সামাজিক চুক্তি’ (social contract) হিসেবে দেখেছেন—যেখানে প্রকৃত সাংবিধানিক ক্ষমতা জনগণের হাতে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটি ব্যতিক্রম তৈরি করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় কাঠামো কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির মতামত নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এটি সরকার গঠনের কোনো বিধান দেয় না; শুধুমাত্র সাংবিধানিক পরামর্শ দেয়। সেই শূন্যতায় জনগণের প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়, যেখানে তিনটি মৌলিক ম্যান্ডেটের একটি ছিল রাষ্ট্রীয় সংস্কার। এভাবেই জনগণের সাংবিধানিক ক্ষমতা কার্যকর হয় এবং রাষ্ট্রপতির আদেশ ওই গণ-অভিপ্রায়ের প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায়।
এই আলোচনার উপসংহারে দুটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
১. সংবিধানের সংজ্ঞা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ‘আদেশ’ আইন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। তাই আদেশ বলবৎ থাকা অবস্থায় অমান্য করা হলে আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
২. যদি আদেশকে রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার বহির্ভূত বলা হয়, তাহলে একই যুক্তিতে ১২তম সংসদ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্তও সাংবিধানিক প্রশ্নের মুখে পড়ে। অর্থাৎ বর্তমান সংসদ ও সরকার গঠনের বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
বস্তুত, আইনি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, সংবিধানের বিধান ও জনগণের সাংবিধানিক ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই চ্যালেঞ্জ। তাই সংবিধানের রক্ষাকর্তাদের জন্য কাঁচের ঘরে বসে ঢিল ছুড়ার কোনো সুযোগ নেই।
- লেখক : ড. নাজিবুর রহমান মোমেন, সংসদ সদস্য

