সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির সম্প্রতি তার ফেসবুক পেজে একটি মন্তব্য প্রকাশ করেছেন, যা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। তিনি লিখেছেন, “দুনিয়ার কোথাও সংবিধান মেনে গণঅভ্যুত্থান হয় না। গণঅভ্যুত্থান হলে সংবিধান অটোমেটিক অকার্যকর হয়ে যায়। যতই গুজামিল দেয়া হউক, ছিদ্র থাকবেই। এটাই চরম বাস্তবতা।
সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবীর মন্তব্য সাম্প্রতিক আলোচনায় একটি ধারণা তৈরি করেছে যে, গণঅভ্যুত্থান মানেই আগের সংবিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। তিনি বলেন, সংবিধানকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা প্রায়ই ‘গুজামিল’ বা কৌশলী ছিদ্রের মাধ্যমে করা হয়।
এটি যেমন সরল ও বাস্তবসম্মত মনে হতে পারে, তেমনই আইনগত ও ব্যবহারিক দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ। ইতিহাসে দেখা যায়, ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯), ইরানি বিপ্লব (১৯৭৯), মিসরের আরব বসন্ত (২০১১) বা ১৯৯০ সালের বাংলাদেশের অভ্যুত্থান সব সময়ই সংবিধানে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। তবে এর মানে এই নয় যে প্রতিটি অভ্যুত্থান সংবিধানকে পুরোপুরি শেষ করে।
বিশ্বজুড়ে অভিজ্ঞতা দেখায়, রাজনৈতিক পরিবর্তন মানেই আইনি শূন্যতা তৈরি হয় না। সংবিধান হঠাৎ করেই বিলুপ্ত হয় না, বরং সংকটের মধ্যে দিয়ে নতুন রূপ নেয়। আমেরিকার আইনবিদ ব্রুস অ্যাকারম্যান বলেছেন, বিপ্লবের মাধ্যমে তৈরি শাসনব্যবস্থা সংবিধানের শত্রু নয়, বরং তার উর্বর ভূমি।
আইনের দার্শনিক ইমানুয়েল সিয়েয়েস বলেছিলেন, ‘জাতি’ হলো সংবিধানের মূল উৎস। তাই যখন জাতি রাস্তায় নামে, তখন আগের সংবিধান বদলানোর ক্ষমতা রয়েছে। তবে এই ক্ষমতার উদ্দেশ্য ধ্বংস নয়, নতুন সংবিধান গঠন। জার্মান আইনবিদ কার্ল শ্মিট বলেন, সংকটের সময় আইন স্থগিত থাকে, কিন্তু এটি চিরস্থায়ী নয়। সংকট কাটলে আইনের কাঠামো পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।
অস্ট্রিয়ার আইনবিদ হ্যান্স কেলসেন সংবিধানকে ‘মৌলিক নিয়ম’ বা গ্রুন্ডনর্ম হিসেবে দেখেছেন। অভ্যুত্থানের পর মৌলিক নিয়ম পরিবর্তিত হতে পারে, তবে আদালত ও রাষ্ট্র কাঠামো যদি পুরনো নিয়ম বজায় রাখে, তাহলে সংবিধান হঠাৎ শেষ হয়ে যায় এমন ধারণা ভুল।
ইতিহাসের উদাহরণ স্পষ্ট। ফরাসি বিপ্লবের সময়ও অনেক পুরনো আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো রাখা হয়েছিল। ১৯৮৯-৯১ সালের পূর্ব ইউরোপের গণঅভ্যুত্থানেও (পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেকোস্লোভাকিয়া) সংবিধান পুরোপুরি বাতিল হয়নি। পুরনো কাঠামোর মধ্য দিয়ে নতুন গণতান্ত্রিক রূপ গড়ে তোলা হয়, যা আইনবিদ জন এলস্টার ‘সাংবিধানিক বুটস্ট্র্যাপিং’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকাতেও বর্ণবাদী শাসনের পর নতুন সংবিধান তৈরি করা হলেও পুরনো আইন কিছু অংশে সংরক্ষিত হয়েছিল। প্রধান বিচারপতি ইসমাইল মাহোমেদ এটিকে ‘অতীত আর ভবিষ্যতের মধ্যে ঐতিহাসিক সেতু’ বলেছেন।
|
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাও অনুরূপ। ১৯৭৫-এর পরের সামরিক অভ্যুত্থান এবং ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান সব সময় সংবিধানে ধাক্কা দিয়েছে, তবে শেষ পর্যন্ত দেশ সংবিধানের কাঠামোতে ফিরেছে। সুপ্রিম কোর্টের ‘আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশ’ মামলায় বলা হয়েছে, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো কোনো অভ্যুত্থানেও বিলুপ্ত হয় না। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পরও সংবিধানের ধারা, বিচার বিভাগ, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজকে কাজে লাগিয়ে নতুন ব্যবস্থা দাঁড় করানো হয়েছে।
এই ধারণা যে গণঅভ্যুত্থান মানেই সংবিধান অকার্যকর হয়ে যায়, স্বৈরতন্ত্রের পথ খোলে। উদাহরণ হিসেবে মিশর দেখুন। ২০১১ সালের জানুয়ারির অভ্যুত্থানে হোসনি মুবারক ক্ষমতাচ্যুত হলেও সংবিধানের শূন্যতার কারণে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। জনগণের জয় সেনা শাসনে রূপান্তরিত হয়।
সংবিধান শুধু সরকার গঠনের নিয়ম নয়। এটি নাগরিক অধিকার, স্বাধীনতা ও বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসনের নিশ্চয়তা দেয়। অভ্যুত্থানের নামে সংবিধানকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করলে, অভ্যুত্থানের মূল উদ্দেশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিটি সংবিধানে অভ্যন্তরীণ ছিদ্র থাকে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথা বা ভারতের সংবিধানে অসামঞ্জস্য। আইনবিদ লরেন্স ট্রাইব বলেন, এগুলো ‘গঠনগত অস্পষ্টতা’, যা সংবিধানকে সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে।
আধুনিক আইনবিদ টম গিন্সবার্গ ও আজিজ হক সংবিধানের স্থিতিস্থাপকতা বা ‘constitutional resilience’ উল্লেখ করেছেন। অভ্যুত্থান, সংকট বা অর্থনৈতিক পতনের পরও সংবিধান টিকে থাকে যদি অভিযোজন ক্ষমতা থাকে। রুটি টাইটেল ও ভিকি জ্যাকসন বলেন, অভ্যুত্থানের পর নতুন কাঠামো পুরনো ও নতুনের মিশ্রণে তৈরি হয়। এটি ‘প্যাঁচানো’ নয়, বরং স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
আইডিয়ার হিসাব অনুযায়ী, ১৯৪৫ সালের পর বিশ্বে যত সাংবিধানিক রূপান্তর হয়েছে, তার ৯০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে সংবিধান দ্রুত নতুন রূপে এসেছে বা ধারাগুলো বজায় রেখেছে। আদালত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, যেমন পাকিস্তান, পর্তুগাল, হাঙ্গেরি ও কলম্বিয়ায়।
গণঅভ্যুত্থান মানেই যে সংবিধান আপনি-আপনি বাতিল হয়ে যায় এই ধারণা ইতিহাস, আইন ও রাজনীতির সরলীকরণ মাত্র। সংবিধান তত্ত্ব, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার আলোকে দেখা যায়, অভ্যুত্থানের পরও সংবিধান টিকিয়ে রাখার বা নতুন করে গড়ার প্রচেষ্টা চলে। আর সেই প্রচেষ্টায় ‘ছিদ্র’ থাকাটা দুর্বলতা নয়, বরং গণতন্ত্রের প্রমাণ। কারণ গণতন্ত্র কখনো নিখুঁত হয় না, এটি মানুষের মতোই ভুল-ভাঙার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে।
আইনবিদ রুটি টাইটেলের ভাষায়, রূপান্তরকালীন সাংবিধানিকতার কাজই হলো আইনের মাধ্যম দিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বাস্তবায়িত করা। এই পথচলা কখনো নিখুঁত হবে না। তাতে ছিদ্র থাকবেই। কিন্তু এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক পথ।
- লেখক : মোকাররামুছ সাকলান, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।

