অপরাধ বোঝা কোনো সহজ কাজ নয়। এটি কেবল আইনের লঙ্ঘন নয়; বরং এটি সমাজের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক কাঠামোরও একটি প্রতিবিম্ব। একই কাজ এক দেশে অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে, অন্য দেশে তা সাধারণ আচরণ মনে করা হতে পারে। তাই অপরাধের ব্যাখ্যা শুধুই আইনগত নয়, এটি ক্ষমতার ভারসাম্য ও সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
ঐতিহ্যগত অপরাধবিজ্ঞান মূলত মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের কর্মকাণ্ড বা সম্পত্তি ক্ষতির দিকে মনোনিবেশ করেছে কিন্তু আধুনিক বিশ্ব বুঝতে পারছে, অপরাধের পরিধি চুরি, ডাকাতি বা খুনের বাইরে বিস্তৃত। কর্পোরেট দুর্নীতি, সাইবার অপরাধ, পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞ—এই সব নতুন চ্যালেঞ্জ ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার প্রথাগত কাঠামোর সংজ্ঞা পুনর্বিন্যাস করছে। এ ধারায় জন্ম নিয়েছে ‘সবুজ অপরাধবিদ্যা’, যা অপরাধের সীমারেখা নতুনভাবে নির্ধারণ করছে।
আমরা মানুষের প্রতি সংঘটিত অপরাধকে সবসময়ই গুরুত্ব দিই কিন্তু পরিবেশের প্রতি ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড প্রায়শই আড়ালেই থাকে। বন উজাড়, নদী দখল, শিল্পবর্জ্য দিয়ে পানিদূষণ, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস এসবই এক ধরনের অপরাধ। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব কেবল বর্তমান প্রজন্ম নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও পড়ে। তাই বাস্তুতন্ত্রের প্রতি যেকোনো আঘাতকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
সবুজ অপরাধবিদ্যা বা গ্রিন ক্রিমিনোলজি মানুষের সঙ্গে অমানুষের (উদ্ভিদ ও প্রাণী) জীবনকে সমান গুরুত্ব দেয়। এটি রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনের সীমাবদ্ধতায় বাঁধা পড়ে না। কোনো দেশে আইনি বিধি থাকুক বা না থাকুক, পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবকে এটি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এটি আন্তর্জাতিকভাবে একটি নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রবর্তন করে, যা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা করে।
বহু দেশে প্রচলিত ফৌজদারি আইনে পরিবেশগত ক্ষতি প্রায়ই গৌণভাবে বিবেচিত হয়। বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান বন দখল বা নদীতে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলার মতো কাজ প্রায়শই আইনের ফাঁকফোকরে পার পেয়ে যায়। সবুজ অপরাধবিদ্যা তর্ক করে যে, যা আইনত বৈধ, তা নীতিগতভাবে সঠিক নাও হতে পারে। আইনি অনুমতি থাকলেও প্রকৃতির প্রতি যেকোনো ক্ষতি জঘন্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত। এই নৈতিক সংকীর্ণতা দূর করাই সবুজ অপরাধবিদ্যার মূল লক্ষ্য।
সবুজ অপরাধবিদ্যার একটি মূল স্তম্ভ হলো বন্যপ্রাণী ও অন্যান্য অমানুষিক প্রাণের অধিকার রক্ষা করা। চোরাচালান, বন্যপ্রাণী হত্যা এবং তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসকে এটি কঠোর অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিটি উপাদানকে রক্ষার দায়বদ্ধতা এই তত্ত্ব প্রচার করে। একটি বিরল প্রজাতির বিলুপ্তি কেবল পরিবেশের ক্ষতি নয়, এটি পৃথিবীর সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি অপরিবর্তনীয় অপরাধ।
বিশ্বের বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি প্রায়ই মুনাফার লোভে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটায়। সস্তা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবহার করে তারা সমুদ্র বা নদী দূষণ করে। সবুজ অপরাধবিদ্যা এই কর্পোরেট ‘দানবদের’ জবাবদিহিতার আওতায় আনার পক্ষে। এ ধরনের অপরাধকে ‘সবুজ কলার অপরাধ’ বলা হয়। যদিও এই অপরাধীরা সরাসরি কাউকে হত্যা করে না, ধীরগতির বিষক্রিয়ার মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা ধ্বংস করে, যা গণহত্যার সমতুল্য।
জলবায়ু পরিবর্তন কেবল প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি মানবসৃষ্ট অপরাধের ফল। উন্নত দেশগুলোর অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার পুরো পৃথিবীকে মহাবিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সবুজ অপরাধবিদ্যা দাবি করে, যারা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করেছে, তাদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের সম্মুখীন করা উচিত। এই পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন এক বৃহৎ পরিবেশগত অপরাধের শিকার।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘ইকোসাইড’ বা বাস্তুতন্ত্র হত্যার ধারণা আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। এর অর্থ হলো ইচ্ছাকৃত বা চরম অবহেলার মাধ্যমে প্রকৃতিকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা। আমাজন বন পোড়ানো বা গভীর সমুদ্রে তেল নিঃসরণ ইকোসাইডের সুস্পষ্ট উদাহরণ। সবুজ অপরাধবিদ্যা দাবি করে, এই ধরনের অপরাধকে যুদ্ধাপরাধ বা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের মতো গুরুত্ব দিয়ে বিচার করা উচিত।
বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। নদী দখল, সুন্দরবন বিনাশী কার্যক্রম এবং কৃষিজমিতে শিল্পায়ন সবই গুরুতর সমস্যা। হাওর ও জলাশয় ভরাট করে বসতি স্থাপন বাস্তুতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। আইনের প্রয়োগ থাকলেও রাজনৈতিক ও পেশিশক্তির প্রভাবে অপরাধীরা প্রায়শই আড়ালে থাকে। বাংলাদেশের সবুজ রক্ষায় সবুজ অপরাধবিদ্যার নীতিগুলো আইনি কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
পরিবেশগত অপরাধের প্রভাব সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ে। বড় ফ্যাক্টরির দূষণ যখন গ্রামের মানুষের খাবার পানি নষ্ট করে, তারা কোনো প্রতিকার পায় না। এ ধরনের অসমতা সবুজ অপরাধবিদ্যা ‘পরিবেশগত বর্ণবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত করে। পরিবেশের সুফল যেমন সবার সমান, পরিবেশগত ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারও সবার থাকা উচিত। ন্যায়বিচার কেবল মানুষের জন্য নয়, প্রকৃতির জন্যও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রযুক্তির ব্যবহার পরিবেশ রক্ষা ও অপরাধ শনাক্তকে সহজ করেছে। উপগ্রহ চিত্র ও ড্রোনের মাধ্যমে বন উজাড় বা অবৈধ খনির কাজ রিয়েল-টাইমে দেখা সম্ভব। সবুজ অপরাধবিদরা বিগ ডাটা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিবেশগত অপরাধের পূর্বাভাস দিচ্ছেন। ডিজিটাল নজরদারি নদী দূষণকারী জাহাজ বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সহজেই শনাক্ত করতে সহায়তা করছে।
সবুজ অপরাধবিদ্যা কেবল শাস্তির কথা বলে না। এটি মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অপরাধ প্রতিরোধের ওপর জোর দেয়। ভোগবাদী জীবনযাত্রা কীভাবে প্রকৃতির ক্ষতি করছে, তা বোঝা জরুরি। প্লাস্টিক কমানো, নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার এবং অপচয় রোধও প্রতিরোধের অংশ। ব্যক্তিগত সচেতনতা ছাড়া কেবল আইন দিয়ে পৃথিবী রক্ষা করা সম্ভব নয়। পরিবেশের প্রতি মমত্ববোধ জাগ্রত করাই শ্রেষ্ঠ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
পরিবেশগত অপরাধ কোনো দেশের সীমার মধ্যে আটকে থাকে না। এক দেশের বায়ুদূষণ অন্য দেশে এসিড বৃষ্টি সৃষ্টি করতে পারে। তাই সবুজ অপরাধ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও ইন্টারপোল একযোগে কাজ করছে। ‘গ্রিন ট্রিটি’ বা সবুজ চুক্তির মাধ্যমে দেশগুলোকে পরিবেশ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হচ্ছে। সম্মিলিত বৈশ্বিক প্রচেষ্টা ছাড়া আন্তঃসীমান্ত পরিবেশগত পাচার ও অপরাধ দমন প্রায় অসম্ভব।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীল করতে শিক্ষা ব্যবস্থায় সবুজ অপরাধবিদ্যা বা পরিবেশগত নৈতিকতা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। স্কুল পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে, প্রকৃতিকে ধ্বংস করা বড় অপরাধ। একটি গাছ কাটা কেবল সম্পদ নষ্ট নয়, এটি একটি জীবের অধিকার কেড়ে নেওয়ার সমতুল্য। উচ্চশিক্ষায় গবেষণা বাড়িয়ে স্থানীয় পরিবেশগত সমস্যার বৈজ্ঞানিক ও আইনি সমাধান খুঁজে বের করা জরুরি।
গণমাধ্যমও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান প্রায়ই মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে অপরাধ ঢেকে রাখতে চায়। সাহসী সাংবাদিকতা ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এসব ‘সবুজ অপরাধ’ জনসমক্ষে আনে। জনমত যদি পরিবেশের পক্ষে শক্তিশালী হয়, সরকার ও প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়।
ফৌজদারি কার্যবিধি ও দণ্ডবিধিতে পরিবেশগত ক্ষতির শাস্তির মাত্রা বাড়ানো উচিত। বিশেষায়িত ‘সবুজ আদালত’ বা এনভায়রনমেন্টাল ট্রাইব্যুনালগুলোর ক্ষমতা সম্প্রসারণ প্রয়োজন। পরিবেশ অধিদপ্তরকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া জরুরি। আইনি সংস্কারের ক্ষেত্রে ‘পলিউটার পেস’ নীতি কঠোরভাবে কার্যকর করা উচিত। অপরাধীকে কেবল জরিমানা করা নয়, ধ্বংসকৃত বাস্তুতন্ত্র পুনর্গঠনের খরচও বহন করতে বাধ্য করা উচিত। সঠিক নীতি ও কার্যকর আইনই টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে। সূত্র: প্রতিদিনের সংবাদ

