অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা চারটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ সংসদে বিল আকারে উত্থাপিত না হওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং মানবাধিকার কমিশন আগের আইনের আওতায় কাজ চালাবে। এর মধ্যে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় মানবাধিকার কমিশন গুম সম্পর্কিত কোনো তদন্ত করতে পারবে না। পাশাপাশি পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ সংশোধন ও উত্থাপনের প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা সীমিত হবে।
বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বিশেষ কমিটিতে এসব অধ্যাদেশ বাতিল বা সংশোধনের নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিলে ভিন্নমত জানিয়েছেন সরকারদলীয় এমপি ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরও। তিনি চারটি অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে তার মতামত বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনভুক্ত হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যাচাইয়ে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে গত ১২ মার্চ ১৪ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির ১১ জন বিএনপির সদস্য। গত বৃহস্পতিবার এই কমিটি পুলিশ কমিশনসহ ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধন এবং ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে উত্থাপন না করার সুপারিশ করেছে। ফলে ১১ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে এই অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে।
দুদকের ক্ষমতা সীমিত হবে:
এ সিদ্ধান্তের ফলে দুদক আবার ২০০৪ সালের আইনের আওতায় চলে যাবে। সংবিধিবদ্ধ এই প্রতিষ্ঠান সরাসরি এজাহার দায়ের বা সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনুমতি ছাড়া মামলা করতে পারবে না। এছাড়া বিদেশে থাকা অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের ক্ষমতা হারাবে। চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের বাছাই কমিটিতেও সরকারি প্রভাব বাড়বে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। ২০০৯ সালের আইন বাতিল হয়েছিল। অধ্যাদেশ বাতিল হলে ২০০৯ সালের আইন পুনর্বহাল হবে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা মানবাধিকার কমিশনের থাকবে না। কমিশন কেবল সুপারিশ করতে পারবে।
গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশনকে গুমের অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় এই ক্ষমতাও চলে যাচ্ছে। অধ্যাদেশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ বিধানও আর থাকবে না।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “সরকার কেন দুদক, মানবাধিকার কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার আইন বাতিল করছে, তা বোধগম্য নয়। এই অধ্যাদেশ না থাকলে প্রতিষ্ঠানগুলো আবার সরকারের অধীনে চলে যাবে।”
সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, অধ্যাদেশগুলো বাতিল হচ্ছে না, পরবর্তীতে আরও শক্তিশালী করে সংসদে উত্থাপন করা হবে। তবে ১১ এপ্রিলের পর কবে কোন অধিবেশনে বিল উত্থাপন হবে তা এখনও নির্ধারিত নয়।
পুলিশের নিয়োগ ক্ষমতা সীমিত:
পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জুলাই জাতীয় সনদে ‘স্বাধীন পুলিশ কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব থাকলেও, বিশেষ কমিটি কমিশনের ক্ষমতা সীমিত করার সুপারিশ করেছে। কমিশন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত বা সুপারিশ করতে পারলেও নিয়োগে সুপারিশ গ্রহণের ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকবে।
সরকারি দলের এমপি নওশাদ জমির বলেছেন, মানবাধিকার কমিশন কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা উচিত নয়। তার মতে, বেশি সরকারি প্রতিনিধি থাকলে কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের গ্রেপ্তারে সরকারের অনুমতির বিধানও তিনি সমর্থন করেননি।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি:
২০০৪ সালের আইনের আওতায় ফিরলে দুদক ‘নখদন্তহীন’ অবস্থায় আসবে। ২০১৩ সালে সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে অনুমতি প্রয়োজন করা হয়েছিল। ২০১৪ সালে হাইকোর্ট এটি বাতিল করলেও, অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে অনুমতি ছাড়াই মামলা দায়েরের সুযোগ দিয়েছিল। অধ্যাদেশ বাতিল হলে আবার ৩২(ক) ধারার বিধান ফিরে আসবে।
মানবাধিকার কমিশনও আবার ক্ষমতাহীন হয়ে যাবে। ২০০৯ সালের আইনের মতো সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের তদন্ত ক্ষমতা থাকবে না। কমিশন কেবল সুপারিশ করতে পারবে।

