তীব্র দাবদাহের মধ্যে আদালতের প্রাঙ্গণে কালো কোট ও ভারী গাউন পরা আইনজীবীদের জন্য হয়ে উঠেছে এক চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। পেশাগত মর্যাদা ও ঐতিহ্য বজায় রাখার সঙ্গে তাপদাহের শারীরিক কষ্ট মেলাতে গিয়ে আইনজীবীরা পড়েছেন ‘হাসফাঁস’ অবস্থায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গরমের দিনে শুনানির সময় হিট স্ট্রোকে আইনজীবীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। উদ্বেগজনক এই পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন জেলা আইনজীবী সমিতি প্রধান বিচারপতির কাছে গ্রীষ্মকালে ড্রেস কোড শিথিলের আবেদন জানিয়েছে।
আবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রীষ্মকাল দীর্ঘ হচ্ছে এবং তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়ছে। ফলে পানিশূন্যতা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, জ্বর, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়েছে। ২০২১ এবং ২০২৩ সালে দায়িত্ব পালনকালে দুই আইনজীবীর হিট স্ট্রোকে মৃত্যু ঘটেছে।
অধস্তন আদালতের অধিকাংশ এজলাসে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় গরমে কোট ও গাউন পরে বিচারকার্য পরিচালনা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতিতে গ্রীষ্মকালে আইনজীবীরা চাচ্ছেন সাদা ফুলশার্ট বা সাদা শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে সাদা নেক ব্যান্ড বা কালো টাই পরিধান করার অনুমতি।
প্রচলিত ঐতিহ্যের সূত্রপাত:
আইনজীবীদের কালো পোশাকের ইতিহাস প্রায় ৩৩২ বছর পুরোনো। ১৬৯৪ সালে ইংল্যান্ডের রানি মেরি মৃত্যুতে রাজার নির্দেশে বিচারক ও আইনজীবীরা শোক প্রকাশের জন্য কালো গাউন পরতে শুরু করেন। পরবর্তীতে এটি আইনি পেশার আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৮৬১ সালে ব্রিটিশ শাসকরা ভারতবর্ষে এই পোশাক বাধ্যতামূলক করেন। ব্রিটিশ শাসন শেষ হলেও ‘কলোনিয়াল লিগ্যাসি’ আজও বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের আদালতে বহাল রয়েছে।
পেশাগত মর্যাদা বনাম তাপমাত্রা:
আইনজীবীদের কাছে কালো কোট ও গাউন শুধুই পোশাক নয়, এটি পেশাগত মর্যাদার প্রতীক। তবে উপকূলীয় অঞ্চলে উচ্চ আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার কারণে এই পোশাক দ্রুত তাপ শোষণ করে। দীর্ঘ সময় পরিধান করা অত্যন্ত কষ্টকর।
আইনজীবীরা স্থায়ী পরিবর্তন নয়, বরং গরমের সময় সাময়িক শিথিলতা চাচ্ছেন। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে এবং পেশাগত মর্যাদাও বজায় থাকবে। দেশের অধিকাংশ আদালত কক্ষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নয়, ফলে বাইরের তাপমাত্রা ৩০–৩৫ ডিগ্রি হলেও আদালতের ভিতরে তা ৩৫–৪০ ডিগ্রি পর্যন্ত অনুভূত হয়।
বিধি ও নিয়মের বাধ্যবাধকতা:
বাংলাদেশে আইনজীবীদের ড্রেস কোড সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ রুলস, সিভিল ও ক্রিমিনাল রুলস অ্যান্ড অর্ডারস এবং বার কাউন্সিল রুলস ১৯৭২ অনুযায়ী নির্ধারিত। এসব বিধিমালায় পেশাগত গাম্ভীর্য বজায় রাখতে কালো কোট ও গাউন বাধ্যতামূলক।

