রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করা মানে সবার পক্ষে দাঁড়ানো কিন্তু আইনের জটিলতায় কখনও কখনও রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা, অ্যাটর্নি জেনারেলকে, নাগরিকের স্বার্থের বিপক্ষে আদালতে অবস্থান করতে হয়। কারণ রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা মাঝে মাঝে নাগরিকের অধিকার অযাচিতভাবে লঙ্ঘন করে। এই ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিক উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন। আদালতে রাষ্ট্রের পক্ষে তার আইনজীবী হন অ্যাটর্নি জেনারেল।
অ্যাটর্নি জেনারেলকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আইন অনুযায়ী সমর্থন দিতে হয়। ফলে তিনি কিছুক্ষণের জন্য নাগরিকের বিপক্ষে অবস্থান নেন। কিন্তু আদালতের বাইরে একই অ্যাটর্নি জেনারেল ও ওই নাগরিকের আইনজীবীরা আবার আইন-প্রেমিক বন্ধু হিসেবে মিলিত হন। এই দ্বৈত ভূমিকা আইন পেশার সৌন্দর্যের অংশ। আইনজীবীরা আশা করেন, নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল নিজেকে প্রকৃত “অ্যাটর্নি অ্যাট লার্জ” হিসেবে প্রমাণ করবেন।
নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল: মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল:
দেশের ১৮তম অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিন দশকের বেশি আইনি অভিজ্ঞতায় তিনি সংবিধানের ত্রয়োদশ ও পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে দাখিল করা মামলায় অংশগ্রহণ করেছেন। তাঁর যুক্তি আদালতের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মামলায় ক্লায়েন্টের স্বার্থ সর্বোচ্চভাবে রক্ষা করা, বিচারসেবা প্রাপ্তিতে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ থাকা—এগুলো তার পরিচয়।
তিনি জুনিয়র আইনজীবীদের উৎসাহিত করেন এবং সুপ্রিম কোর্টে আদালত-সংক্রান্ত বিভিন্ন সেশন আয়োজন করেন। প্রাজ্ঞ বিচারপতি ও অভিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবীদের তত্ত্বাবধানে এই আয়োজন আইনের জ্ঞান বৃদ্ধি ও আইনজীবী সমাজকে প্রেরণা দেয়।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে অ্যাটর্নি জেনারেলের ভূমিকা:
ইতিহাসে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭২ সালের নির্বাচনের আগে সব টেপ চেয়ে নিক্সনকে বাধ্য করেছিলেন আর্চিবাল্ড কক্স। প্রতিশোধপরায়ণ নিক্সন কক্সকে বরখাস্তের নির্দেশ দেন। কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেল এলিয়ট রিচার্ডসন পদত্যাগ করে শাসনতন্ত্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন।
নিউ জার্সির অ্যাটর্নি জেনারেল জেফ্রি চেইসার মতে, একজন আইন উপদেষ্টা হিসেবে অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব হলো প্রণীত আইনগুলোর সাংবিধানিক বৈধতা রক্ষা করা। বাংলাদেশেও অ্যাটর্নি জেনারেলরা এ ধরনের সংবিধানিক দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব:
অ্যাটর্নি জেনারেল রাজনৈতিক নিয়োগ। যেহেতু সরকার রাজনৈতিক দলের অধীনে কাজ করে, তাই আদালতে তাদের কাজ প্রায়শই সরকারের রাজনৈতিক দর্শন অনুযায়ী হয়। সংবিধানের অভিপ্রায় অনুযায়ী বিচার বিভাগও জনগণের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা রক্ষায় দায়িত্বশীল।
উদাহরণস্বরূপ, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাষ্ট্রপতির আদেশ কি অসাংবিধানিক—এ বিষয়ে মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর উপসংহার: রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়, তাই ২০২৫ সালের ১ নম্বর আদেশ সাংবিধানিক ক্ষমতা বহির্ভূত। এটি প্রমাণ করে অ্যাটর্নি জেনারেলের কাজ শাস্ত্রীয় ও সাংবিধানিক নীতি অনুসারে।
নতুন অ্যাটর্নি জেনারেলের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো শুধুমাত্র সরকারের পক্ষ নয়, বরং সর্বজনীন দায়িত্বশীলতার মানদণ্ড বজায় রেখে “অ্যাটর্নি অ্যাট লার্জ” হয়ে ওঠা। সংবিধানের ধ্রুপদি ধারাকে সমুন্নত রাখা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা হবে তাঁর মূল লক্ষ্য।
- এম এম খালেকুজ্জামান: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

