তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের নির্দেশনা দিয়ে দেওয়া হাইকোর্টের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার করার প্রশ্নে এ রায়কে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ রায় দেন। সম্প্রতি প্রকাশিত ১৮৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা রাখা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ। এ ক্ষেত্রে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রায়ে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আনা পরিবর্তন এবং ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীর সংশ্লিষ্ট ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। আদালত উল্লেখ করেছেন, অষ্টম ও ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত মামলার সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে মূল সংবিধানের অবস্থাই বহাল থাকবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা, ২০১৭–কেও সংবিধানবিরোধী ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ে বলা হয়, এ বিধিমালা পুনর্বহালকৃত ১১৬ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিষয়ে পূর্ববর্তী নির্দেশনার সঙ্গেও মিল নেই।
এই মামলার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট। সুপ্রিম কোর্টের সাত আইনজীবী সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়ের করেন। প্রাথমিক শুনানি শেষে একই বছরের ২৭ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করেন। এতে জানতে চাওয়া হয়, সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ ও ২০১৭ সালের বিধিমালা কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না এবং কেন বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠন করা হবে না।
পরবর্তী সময়ে বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর বেঞ্চে শুনানি শুরু হলেও বেঞ্চ পুনর্গঠনের পর বিচারপতি আহমেদ সোহেল যুক্ত হন। নতুন বেঞ্চে ২৩ এপ্রিল থেকে শুনানি শুরু হয়ে শেষ পর্যন্ত ২ সেপ্টেম্বর রায় ঘোষণা করা হয়।
রিটের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির, মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন ও জায়েদ বিন আমজাদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মেহেদি হাসান। এ ছাড়া অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে শরীফ ভূঁইয়া এবং ইন্টারভেনর হিসেবে আহসানুল করিম শুনানিতে অংশ নেন।
রায়ে বিচার বিভাগের কাঠামোগত বিবর্তনের বিষয়টিও উঠে এসেছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের ওপর ছিল। পরে বিভিন্ন সংশোধনের মাধ্যমে তা রাষ্ট্রপতির কাছে ন্যস্ত করা হয় এবং পর্যায়ক্রমে নির্বাহী বিভাগের সম্পৃক্ততা বাড়ে। ১৯৯৯ সালে আপিল বিভাগের রায়ে বিচার বিভাগ পৃথক করার নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হতে সময় লাগে।
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা হয়। তবে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও পৃথক সচিবালয় গঠন হয়নি। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতের দাবিতে আবারও বিষয়টি সামনে আসে।
হাইকোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৩০ নভেম্বর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়। এরপর ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ সচিবালয়ের কার্যালয় উদ্বোধন করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এ রায়ের মাধ্যমে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন জোরদারের পথ আরও সুগম হলো। এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৃথক সচিবালয় বাস্তবায়নই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

