শ্রম আইন সংশোধন ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক নেতাদের মতে, শ্রম (সংশোধন) বিল ২০২৬-এ এমন কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, যার ফলে অনেক কর্মী গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও সুরক্ষামূলক সুবিধা হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
গত বৃহস্পতিবার সংসদে বিলটি পাস হয়। এতে শ্রমিকের সংজ্ঞায় কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্ত করার বিধান বাদ দেওয়া হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ নানা সুবিধা থেকে একটি বড় অংশ বঞ্চিত হতে পারেন বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জাতীয় সংসদে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর পক্ষে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বিলটি উত্থাপন করেন। পরে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ’ জারি করেছিল। সেই অধ্যাদেশে শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ‘ব্ল্যাকলিস্টেড করা যাবে না’ বলা থাকলেও নতুন সংশোধনীতে শব্দ পরিবর্তন করে ‘অন্যায়ভাবে ব্ল্যাকলিস্টেড করা যাবে না’ যুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া নতুন সংশোধনীতে কারখানায় গঠিত ট্রেড ইউনিয়ন এবং পরবর্তীতে গঠিত কালেক্টিভ বার্গেনিং এজেন্ট (সিবিএ)-এর কিছু মৌলিক অধিকারও বাতিল করা হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রভিডেন্ট ফান্ড গঠনের নিয়মও আরও কঠোর করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
শ্রম সংস্কার কমিটির চেয়ারম্যান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, “আইনের সংশোধনীতে বেশকিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা সরকারের অঙ্গীকারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এমনকি ত্রিপক্ষীয় কমিটিতে একমত হওয়া কিছু বিষয়ও নতুন সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ পান, তারা শ্রম আইনের সংজ্ঞায় না থাকায় শ্রমিকদের মতো সার্ভিস বেনিফিট পান না। তাদেরকে এ সুবিধার আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছিল।”
এদিকে বাংলাদেশ লেবার কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক নাজমা আক্তার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শ্রমিক সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “১০ থেকে ১৫ বছর বা তারও বেশি সময় কাজ করার পর একজন কর্মচারী বা কর্মকর্তা বেতনের বাইরে কোনো সুবিধা পান না। তাদের সুবিধার আওতায় আনার পর নতুন সরকারের এ সিদ্ধান্ত যৌক্তিক হয়নি। এটি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।”
তিনি আরও মন্তব্য করেন, “‘অন্যায়ভাবে ব্ল্যাকলিস্টেড করা’ বিষয়টি ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্ন নয়; এটি শ্রমিকের অধিকার হরণের বিষয়।” সিবিএর কিছু অধিকার খর্ব হওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এটি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কনভেনশনে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির লঙ্ঘন।” তার মতে, “নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা আরও বেশি ছিল, কিন্তু তারা উল্টো পথে হেঁটেছে।”
অন্যদিকে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এম হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে শিল্প খাতের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের শ্রমিক সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়ার পক্ষে মত দেয় এবং সংশোধনীকে সমর্থন জানিয়েছে। তাদের দাবি, আগের পরিবর্তনগুলো অস্পষ্টতা তৈরি করেছিল এবং শিল্প খাতে অস্থিরতার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছিল। পাশাপাশি এসব বিধান বিদেশি ক্রেতাদের কাছেও নেতিবাচক বার্তা দিতে পারত বলে সংগঠনটি মনে করে।

