গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কার্যকারিতা এবং মানব মর্যাদা রক্ষায় আইনের শাসন ও সুশাসনকে মৌলিক ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। বাংলাদেশে এসব নীতি সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হলেও বাস্তব প্রয়োগে এর পূর্ণ প্রতিষ্ঠা এখনও হয়নি। ফলে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার এবং বাস্তবতার মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কীভাবে কার্যকরভাবে আইনের শাসন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে ধারণাগত স্পষ্টতা প্রয়োজন, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও তুলনামূলক অভিজ্ঞতার আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা জরুরি। আইনের শাসন বলতে এমন একটি ব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়, নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা হয় এবং স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা হয়। এই কাঠামোয় রাষ্ট্র, ব্যক্তি বা কোনো প্রতিষ্ঠানই আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না।
এই ধারণার ভিত্তি নিহিত রয়েছে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র (UDHR)-এ। সেখানে আইনের সামনে সমতা এবং ন্যায্য বিচারের অধিকারকে মৌলিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। একইভাবে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICCPR)-এ ব্যক্তিস্বাধীনতা, ন্যায্য বিচার এবং আইনগত সুরক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সুশাসন ধারণাটি আরও বিস্তৃত। এটি মূলত রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রয়োগের প্রক্রিয়া ও মানদণ্ডকে নির্দেশ করে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) এবং বিশ্বব্যাংকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সুশাসনের প্রধান উপাদান হলো অংশগ্রহণ, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, কার্যকারিতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলকতা।
এছাড়া অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICESCR)-এ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবনমান উন্নয়নের মতো মৌলিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করাকেও সুশাসনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, আইনের শাসন মূলত আইন ও বিচার কাঠামোর ওপর জোর দেয়, আর সুশাসন রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক—সব দিককে একসঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করে একটি বিস্তৃত কাঠামো তৈরি করে। ফলে দুটি ধারণাই একে অপরের পরিপূরক এবং আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) সুশাসনের যেসব উপাদান চিহ্নিত করেছে, তার মধ্যে রয়েছে অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, ন্যায্য আচরণ এবং আইনের শাসন। এসব উপাদান ইঙ্গিত দেয় যে সুশাসন শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয় নয়, বরং জনগণের অংশগ্রহণ এবং ন্যায়ভিত্তিক সেবা নিশ্চিত করার একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া।
অন্যদিকে, ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (WJP) আইনের শাসনকে মূল্যায়ন করে বিভিন্ন সূচকের মাধ্যমে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি, উন্মুক্ত সরকার ব্যবস্থা, মৌলিক অধিকার সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা, নিয়ন্ত্রক কার্যকারিতা এবং বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা।
এই সূচকগুলো থেকে স্পষ্ট হয়, আইনের শাসন শুধু আইন প্রণয়নেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর কার্যকর প্রয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর এটি গভীরভাবে নির্ভরশীল।
একইভাবে বিশ্বব্যাংকের বিশ্বব্যাপী গভর্ন্যান্স সূচক (WGI)-এ সুশাসনের ছয়টি প্রধান মাত্রা উল্লেখ করা হয়েছে—জনগণের কণ্ঠ ও জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সরকারের কার্যকারিতা, নিয়ন্ত্রক মান, আইনের শাসন এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ। এসব সূচক একসঙ্গে নির্দেশ করে যে সুশাসন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা, যেখানে রাজনৈতিক পরিবেশ, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ইউরোপীয় দেশসমূহে আইনের শাসন ও সুশাসন:
ইউরোপীয় দেশগুলোতে আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের ফল। শক্তিশালী আইনগত কাঠামো, জবাবদিহিতা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ভিত্তিতে এসব দেশ তাদের শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
জার্মানিতে একটি নিয়মভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো কার্যকর রয়েছে, যেখানে আইনকে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে কঠোর আইনি বিধিনিষেধ অনুসরণ করা হয়। পাশাপাশি স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং ফেডারেল শাসন কাঠামো ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নেদারল্যান্ডসের শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে ঐকমত্যভিত্তিক বা কনসেনসাস মডেলের ওপর। এখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষের মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে নীতি নির্ধারণ করা হয়। এই পদ্ধতি সামাজিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করে এবং নীতিগত গ্রহণযোগ্যতাকে শক্তিশালী করে।
সুইডেন এবং নরওয়ের মতো নর্ডিক দেশগুলো প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং উচ্চ সামাজিক আস্থার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। এসব দেশে উন্মুক্ত সরকার ব্যবস্থা কার্যকর, যার ফলে নাগরিকরা সহজেই সরকারি তথ্য পেতে পারেন এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন।
ফিনল্যান্ড দুর্নীতি দমন, প্রশাসনিক পেশাদারিত্ব এবং দক্ষ শাসনব্যবস্থার একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। এখানে যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সীমিত উপস্থিতি প্রশাসনিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করে।
ডেনমার্কে কল্যাণভিত্তিক শাসনব্যবস্থা নাগরিকদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে। রাষ্ট্রীয় সেবার সমান বণ্টন সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতার ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করে।
এই অভিজ্ঞতাগুলো থেকে স্পষ্ট যে, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং কার্যকর জবাবদিহিতা ছাড়া আইনের শাসন ও সুশাসন টেকসইভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং নাগরিক আস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আইনের শাসন ও সুশাসনের চিত্র একদিকে শক্তিশালী সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও অন্যদিকে বাস্তব প্রয়োগে বেশ কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এই ব্যবধানই মূলত শাসনব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার দুর্বলতা এখানে একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থায় বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষমতার প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে শাসন কাঠামোর ভারসাম্য নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
দুর্নীতি বাংলাদেশের সুশাসন ব্যবস্থার আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির উপস্থিতির কথা উঠে এসেছে। এর ফলে জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়।
ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকারও অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। মামলার দীর্ঘসূত্রিতা, জট এবং ব্যয়বহুল আইনি প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন করে তোলে। এটি নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICCPR)-এ উল্লেখিত ন্যায্য বিচারের নীতির সঙ্গে অসঙ্গতির ইঙ্গিত দেয়।
একইসঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে কিছু উদ্বেগও রয়েছে। এসব বিষয় মৌলিক অধিকারের পূর্ণ সুরক্ষার ক্ষেত্রে ঘাটতির দিক নির্দেশ করে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যও সুশাসনের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রকে দুর্বল করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানে বৈষম্য অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICESCR)-এর লক্ষ্য পূরণে বাধা সৃষ্টি করে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে দেখা যায়, বিভিন্ন দেশ ভিন্ন ভিন্ন কাঠামোর মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করেছে। সুইজারল্যান্ডে বিকেন্দ্রীকরণ এবং সরাসরি গণতন্ত্র নাগরিক অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়ার ফলে প্রশাসন আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর হয়েছে।
অন্যদিকে সিঙ্গাপুর কঠোর দুর্নীতি দমন নীতি এবং দক্ষ প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে একটি শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। কার্যকর আইন প্রয়োগ ও পেশাদার প্রশাসন এখানে জনআস্থা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো যেমন সুইডেন ও নরওয়ে সুশাসনের সঙ্গে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার সমন্বয় ঘটিয়েছে। সমতা, স্বচ্ছতা এবং উন্নত সামাজিক সেবার কারণে এসব দেশের শাসনব্যবস্থা আন্তর্জাতিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (WJP)-এর মূল্যায়নে দেখা যায়, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, নিয়ন্ত্রক প্রয়োগ এবং মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক উন্নত দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। এই সূচকে সরকারি জবাবদিহিতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি, উন্মুক্ত সরকার এবং ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকারকে মূল মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়।
এই বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, আইনের কার্যকর প্রয়োগ কেবল আইনি কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না, বরং প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার ওপরও গভীরভাবে নির্ভরশীল। একইসঙ্গে সামাজিক আস্থাও সুশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। যেখানে নাগরিকরা রাষ্ট্র ও তার প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখে, সেখানে আইন মানার প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়।
অতএব, বাংলাদেশে আইনের শাসন ও সুশাসন কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি, কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং নাগরিক আস্থা গড়ে তোলা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সুশাসনের আলোচনায় সমতার পাশাপাশি ন্যায়সংগত আচরণও একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে বিবেচিত হয়। সমতা যেখানে সবার জন্য একই ধরনের আচরণ নিশ্চিত করে, সেখানে ন্যায়সংগত আচরণ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ভিন্নতা এবং কাঠামোগত বৈষম্য বিবেচনায় নিয়ে ন্যায্য ফলাফল নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়।
নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICCPR) মূলত আইনের সামনে সমতা এবং বৈষম্যহীনতার নীতিকে প্রতিষ্ঠা করে। এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে, জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক আইনগতভাবে সমান সুরক্ষা পাবে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICESCR) কেবল আনুষ্ঠানিক সমতার সীমায় না থেকে বাস্তব জীবনে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মৌলিক সেবায় ন্যায্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ, এটি ফলাফলভিত্তিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার ধারণাকে সামনে আনে।
এই দুই চুক্তির সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি দেখায় যে, সমতা কেবল আইনি ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকলে তা যথেষ্ট নয়; বরং বাস্তব জীবনে সুযোগ ও সুবিধার ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করাই টেকসই ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি। একই ধারায় বিশ্বব্যাংক তাদের উন্নয়ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছে যে, শুধু আনুষ্ঠানিক সমতা নয়, বরং সুযোগের ন্যায্য বণ্টন এবং প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য হ্রাস টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসনের অপরিহার্য শর্ত। এই দৃষ্টিভঙ্গি উন্নয়নকে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক ন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত করে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP)-এর অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন ধারণাও একই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে। এখানে “কাউকে পেছনে না ফেলা” নীতির মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, অধিকার এবং সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে আইনের শাসন ও সুশাসন বিশ্লেষণে জাতিকেন্দ্রিকতা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ধারণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জাতিকেন্দ্রিকতা এমন একটি প্রবণতা, যেখানে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মূল্যবোধ ও মানদণ্ডকে সর্বজনীন হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এর ফলে প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বাস্তবতা ও চাহিদা অনেক সময় উপেক্ষিত থাকে। এর বিপরীতে সাংস্কৃতিক মোজাইক এবং মেল্টিং পট ধারণা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়। এখানে বিভিন্ন সংস্কৃতি, পরিচয় ও সামাজিক বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিয়ে সহাবস্থানের সুযোগ তৈরি করা হয়। এতে সমাজে বৈচিত্র্য বজায় থাকে এবং নীতিনির্ধারণ আরও বাস্তবসম্মত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি দমন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যকারিতা এবং স্বায়ত্তশাসন বাড়ানোর বিষয়টি এখানে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। এখানে ICCPR-এর বৈষম্যহীনতার নীতি এবং ICESCR-এর অন্তর্ভুক্তিমূলক অধিকারের ধারণা একসঙ্গে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেয়। পাশাপাশি UNDP এবং বিশ্বব্যাংকের শাসন কাঠামোও ন্যায়সংগত এবং বৈচিত্র্য-সংবেদনশীল নীতিনির্ধারণকে কার্যকর সুশাসনের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশে আইনের শাসন ও সুশাসন কার্যকর করতে হলে জাতিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে এসে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়া অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। যেখানে সব গোষ্ঠীর পরিচয়, অধিকার এবং অংশগ্রহণ সমানভাবে স্বীকৃত হবে, সেখানেই টেকসই সুশাসনের ভিত্তি শক্তিশালী হবে।
উন্নয়নের পথ:
বাংলাদেশে আইনের শাসন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে একক কোনো পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; বরং বহুমাত্রিক এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা অপরিহার্য।
প্রথমত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। আদালতকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত রেখে স্বতন্ত্রভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে ন্যায়বিচার প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ থাকে।
দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি দমন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কার্যকারিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন জোরদার করা হলে জবাবদিহিতা বাড়বে।
তৃতীয়ত, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার সহজ করা প্রয়োজন। আইনি সহায়তা সেবা সম্প্রসারণ, বিচার প্রক্রিয়ার জটিলতা হ্রাস এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চতুর্থত, মৌলিক অধিকার সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতা বাড়ানো এই লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
পঞ্চমত, অন্তর্ভুক্তিমূলক সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা জরুরি। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায় যে সামাজিক খাতে শক্তিশালী বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে সমতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে।
এছাড়া, সুইজারল্যান্ডের মতো বিকেন্দ্রীকরণ এবং নাগরিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করলে স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহিতা ও প্রশাসনিক কার্যকারিতা উন্নত হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায় যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার করা, ই-গভর্ন্যান্স সম্প্রসারণ এবং তথ্যপ্রাপ্তির স্বচ্ছতা বৃদ্ধি সুশাসনকে শক্তিশালী করে। পাশাপাশি উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জাপান শক্তিশালী আইনগত প্রতিষ্ঠান এবং পেশাদার আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। তাদের শাসনব্যবস্থা মূলত আইনগত পূর্বানুমানযোগ্যতা, কম দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, মালয়েশিয়া সাম্প্রতিক সময়ে শাসন সংস্কারের পথে অগ্রসর হয়েছে। সেখানে দুর্নীতি দমন কাঠামো শক্তিশালী করা, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর।
বাংলাদেশে আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান চ্যালেঞ্জ কেবল আইন বা নীতির ঘাটতি নয়, বরং এর কার্যকর বাস্তবায়ন। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র (UDHR), নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICCPR) এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICESCR) একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ভিত্তি প্রদান করে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) এবং বিশ্বব্যাংকের কাঠামো নীতিগত দিকনির্দেশনা ও মূল্যায়নের মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে।
এই কাঠামোর আলোকে স্পষ্ট হয় যে, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূর করা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই সুশাসন সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নাগরিক অংশগ্রহণ।
অতএব, বাংলাদেশে আইনের শাসন শক্তিশালী করতে হলে কাঠামোগত সংস্কার, ডিজিটাল রূপান্তর এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য।
- রেজাউল করিম সোহাগ : চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

