জনস্বার্থে প্রাণী অধিকার সুরক্ষায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খন্দকার হাসান শাহরিয়ার একাধিক মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন। আজ (রবিবার) ডাকযোগে ও ই-মেইলের মাধ্যমে এই নোটিশ পাঠানো হয়।
নোটিশে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং আমদানি-রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তরকে বিবাদী করা হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়েছে, বাগেরহাটে কুকুর হত্যার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আগামী তিন দিনের মধ্যে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসঙ্গে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে নোটিশে উল্লিখিত ২১টি সুপারিশ বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পদক্ষেপ না নেওয়া হলে উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করা হবে বলেও জানানো হয়।
নোটিশে দেশে প্রাণীর ওপর নির্যাতন উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, কুকুর, বিড়াল, গরু, ছাগলসহ গৃহপালিত প্রাণী নিয়মিত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। একই সঙ্গে বন্যপ্রাণী হত্যার ঘটনাও ঘটছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাণীর ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, সমাজে এখনো প্রাণীকে ‘বস্তু’ হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে, যা নির্যাতনকে উৎসাহিত করছে। শিশুদের মধ্যে সহানুভূতিশীল মানসিকতা গড়ে না উঠলে ভবিষ্যতে সহিংস প্রবণতা বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
নোটিশে বাগেরহাটের খানজাহান আলীর মাজার এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়, যেখানে একটি জীবন্ত কুকুরকে কুমিরের মুখে ফেলে দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। আইনজীবীর দাবি, এটি পরিকল্পিত ও নিষ্ঠুর একটি কাজ এবং প্রচলিত আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কুমিরকে জীবন্ত প্রাণী খাওয়ানোর একটি অমানবিক প্রথা চলে আসছে, যা বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
নোটিশে প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯-এর ধারা ৬ ও ৭ অনুযায়ী প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা ও যন্ত্রণাদায়ক হত্যাকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এতে সর্বোচ্চ ছয় মাস কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪২৯ ধারায় গৃহপালিত প্রাণী হত্যা বা পঙ্গু করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮ ও ৩২ অনুযায়ী পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলেও নোটিশে বলা হয়েছে। প্রাণী সুরক্ষায় মোট ২১টি সুপারিশও এতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এগুলো হলো—
- প্রাণিকল্যাণ আইন সংশোধন করে শাস্তি বৃদ্ধি করা
- প্রাণী নির্যাতনকে কগনাইজেবল অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা
- প্রতিটি উপজেলায় প্রাণী হাসপাতাল ও মোবাইল ভেট ইউনিট স্থাপন
- জাতীয় Animal Welfare Authority গঠন
- প্রাণী পুলিশের বিশেষ ইউনিট গঠন
- পোষাপ্রাণীর ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন ও মাইক্রোচিপ ব্যবস্থা চালু
- ২৪/৭ হটলাইন ও রেসকিউ টিম চালু
- স্কুল-কলেজে প্রাণী কল্যাণ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা
- পেট শপ ও সেল্টার হোমে লাইসেন্স ও সিসিটিভি বাধ্যতামূলক করা
- পোষাপ্রাণী বিদেশে নেওয়ার ক্ষেত্রে কর ও ফি প্রত্যাহার
- প্রাণীর জন্য কবরস্থান ব্যবস্থা চালু
- বিনামূল্যে টিকাদান কর্মসূচি চালু
- স্পে-নিউটার কার্যক্রম চালু করা
আইনজীবী খন্দকার হাসান শাহরিয়ার বলেন, প্রাণী সুরক্ষা শুধু মানবিকতার বিষয় নয়, এটি পরিবেশ রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে বিষয়টি আদালতে তোলা হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

