কিছুদিন আগেই নির্মম ঘটনার শিকার হলেন দীপ্ত টিভির এক সংবাদকর্মী। একটি ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে বিরোধের জেরে তার প্রাণহানি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো দেশের আবাসন খাতের অরাজকতার ভয়াবহ চিত্র। এই খাতের অব্যবস্থাপনা ও দুর্বৃত্তায়নের শিকার কেবল ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজ। উন্নত নগরায়নের স্বপ্ন নিয়ে গড়ে ওঠা এ খাত আজ পরিণত হয়েছে এক বিপজ্জনক খেলায়, যেখানে নীতিহীনতা ও প্রতারণা যেন প্রতিষ্ঠিত রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অব্যবস্থাপনার মূলে কী?
আবাসন ব্যবসা, যাকে সহজ ভাষায় বলা যায় “কই এর তেলে কই ভাজা”। এখানে ক্রেতার অর্থ ব্যবহার করেই প্রজেক্ট শেষ করা হয় এবং মুনাফা নিশ্চিত করা হয়। তবে সমস্যা হচ্ছে-ডেভেলপারদের একটি বড় অংশ ব্যবসায়িক নৈতিকতার ধার ধারেন না। ভূমি মালিকদের চুক্তি অনুযায়ী সময়মতো ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়া, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রজেক্ট শেষ করা কিংবা স্বচ্ছতার ভিত্তিতে চুক্তি পালন করার মতো মৌলিক নীতিগুলো অনেক সময় তাদের কর্মপরিকল্পনায় থাকে না।
অনেক ডেভেলপার কোম্পানি, বিশেষ করে ছোট এবং অবিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো, চুক্তিবদ্ধ ফ্ল্যাট নির্মাণে দেরি করে। অন্য ক্রেতাদের কাছে ফ্ল্যাট পুনর্বিক্রয় করে কিংবা ভূমি মালিকের ফ্ল্যাট হস্তান্তর করতে গড়িমসি করে। এর ফলে, একদিকে জমির মালিক ও ক্রেতারা প্রতারিত হন, অন্যদিকে আইনি জটিলতায় গোটা প্রক্রিয়া আটকে যায়।
একটি কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার প্রয়োজন-
আবাসন খাতে বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রয়োজন। ঠিক যেমন ব্যাংকিং খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে একটি কঠোর রেগুলেটরি কাঠামো রয়েছে, তেমনিভাবে আবাসন খাতেও একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করা জরুরি। ডেভেলপার কোম্পানিগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন জমা রেখে ব্যবসার অনুমতি দেওয়া এবং প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সেই অর্থ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত।
বর্তমানে রিহ্যাব (রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) নামক সংস্থা আবাসন খাতের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকলেও এর কার্যকারিতা অত্যন্ত সীমিত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, রিহ্যাবের মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়ার উদাহরণ নেই বললেই চলে। এমনকি আদালতের শরণাপন্ন হলেও সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে নতুন জটিলতার সৃষ্টি হয়।
আইন ও নৈতিকতার ফাঁকফোকর-
২০১০ সালের “রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন” অনুযায়ী নির্মাণাধীন ফ্ল্যাট বরাদ্দের অনুমতি থাকলেও, বরাদ্দপত্রের রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক নয়। এ আইনের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে অনেক ডেভেলপার একই ফ্ল্যাট একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে। বায়নামূলের রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব হতে পারে। তদুপরি, ডেভেলপারদের সুনামের ভিত্তিতে নির্ভরশীলতার পরিবর্তে আইনের আওতায় তাদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
দায় কার?
এখানে শুধু ডেভেলপারদের দোষারোপ করাই যথেষ্ট নয়। ভূমি মালিকদেরও উচিত ডেভেলপার নির্বাচনে সতর্ক থাকা। অতিরিক্ত সাইনিং মানি কিংবা মুনাফার প্রলোভনে পড়ে খারাপ ডেভেলপারদের হাতে জমি তুলে দেওয়ার প্রবণতাও সমস্যার অন্যতম কারণ। ভালো ডেভেলপাররা হয়তো তুলনামূলক কম অগ্রিম অর্থ প্রদান করে কিন্তু প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। অন্যদিকে, ভুঁইফোড় ডেভেলপাররা প্রাথমিক আকর্ষণীয় শর্ত দিয়ে ফাঁদ পেতে ব্যবসা বন্ধ করে দেয়ার পরিকল্পনা করে।
ডেভেলপারদের পাশাপাশি ক্রেতাদেরও সতর্ক থাকতে হবে। ফ্ল্যাট কেনার সময় নির্মাণাধীন ফ্ল্যাটের বরাদ্দপত্র রেজিস্ট্রেশন এবং ডেভেলপার সম্পর্কে সঠিক তথ্য যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
উদাহরণস্বরূপ দুর্নীতি ও প্রতারণার চিত্র-
Pleasant প্রপার্টিজ নামে একটি ডেভেলপার কোম্পানির প্রতারণার চিত্র এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। টিভি রিপোর্ট অনুযায়ী, তারা ভূমি মালিককে প্রাপ্ত ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দিয়ে অরেজিস্টার্ড চুক্তিতে অন্য ক্রেতার কাছে তা বিক্রি করেছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। “যার অধিকার নেই, সে কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারে না”-এই মৌলিক নীতিকে উপেক্ষা করে তারা প্রতারণার মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে।
এমনকি, ২০১৬ সালে শুরু হওয়া একটি প্রজেক্ট, যার কাজ দীর্ঘদিন বন্ধ ছিলো এবং এখনো অসমাপ্ত, তা-ও Pleasant প্রপার্টিজের দখলে। এর মধ্য দিয়ে এ খাতের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা ও দুর্বলতাগুলো সামনে এসেছে।
পরিস্থিতি বদলাতে যা করতে হবে-
আবাসন খাতের বর্তমান অরাজক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন আইন সংস্কার, কঠোর নজরদারি এবং ক্রেতা ও জমির মালিকদের সচেতনতা।
1. রেগুলেটরি বডির শক্তিশালী ভূমিকা: রিহ্যাব বা অন্য কোনো সংস্থার কার্যকর তত্ত্বাবধানে আবাসন ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে।
2. আইনগত বাধ্যবাধকতা: বরাদ্দপত্র রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করে ক্রেতার স্বার্থ সংরক্ষণ করতে হবে।
3. সতর্কতা: জমির মালিকদের উচিত কমিটমেন্ট রক্ষায় দক্ষ ডেভেলপারদের সঙ্গে কাজ করা এবং ক্রেতাদের উচিত বায়না রেজিস্ট্রেশন নিশ্চিত করা।
দীপ্ত টিভির সাংবাদিকের এই নির্মম মৃত্যু শুধু একটি অপরাধ নয়। এটি দেশের আবাসন খাতের অনিয়মের গভীর ক্ষতকে উন্মোচিত করেছে। সময় এসেছে এসব প্রতারণা রোধে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের। অন্যথায়, এ খাতের সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।

