বিশ্বের বৃহত্তম ফিউচারিস্টদের সমাবেশ হিসেবে পরিচিত দুবাই ফিউচার ফোরাম ২০২৪ সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়েছে দুবাইয়ের ‘মিউজিয়াম অব দ্য ফিউচার’-এ।
১০০টি দেশের ২ হাজার ৫০০-এরও বেশি বিশেষজ্ঞ দুই দিনব্যাপী এই ফোরামে অংশগ্রহণ করেন। আলোচনা ও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মানবজাতির ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি, প্রকৃতি এবং উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপনের উপায়।
ফোরামের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে পরিবেশ সুরক্ষায় আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করার বিষয়টি। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল “ফিউচারিং দ্য ল: হুইচ রাইটস উইল নেচার স্ট্যান্ড ফর?” শীর্ষক প্যানেলে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন-
“প্রাকৃতিক আইন সর্বোচ্চ আইন। আমাদের নীতি ও পদক্ষেপ যদি এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে প্রকৃতি নিজস্ব ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে। অভিভাবক ছাড়া নদী ও পরিবেশের দায়িত্ব কে নেবে?”
তিনি জোর দেন, পরিবেশ সুরক্ষায় শক্তিশালী ও কার্যকর আইন ছাড়া প্রকৃতি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা অসম্ভব।
এমিরেটস নেচার-ডব্লিউডব্লিউএফ-এর মহাপরিচালক লায়লা আবদুল্লাতিফ ফোরামে জলবায়ু পরিবর্তনের আর্থিক ক্ষতি এবং প্রকৃতির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন।
তিনি বলেন- “জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রকৃতি একটি বিশাল মিত্র। প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান জলবায়ুর তীব্রতা ২৬% পর্যন্ত কমানোর সম্ভাবনা রাখে। কিন্তু এ জন্য প্রকৃতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।”
লায়লা সতর্ক করেন- ২০৩০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আর্থিক ক্ষতি ৮০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে। তিনি প্রবাল প্রাচীর এবং ম্যানগ্রোভ বন সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন, যা উপকূলীয় এলাকা রক্ষা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
‘লংজেভিটি সিটিজ: ইউটোপিয়া না ডাইস্টোপিয়া?’ শীর্ষক অধিবেশনে ওকিনাওয়া রিসার্চ সেন্টার ফর লংজেভিটি সায়েন্স-এর পরিচালক ড. মাকোটো সুজুকি দীর্ঘায়ুর গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “দীর্ঘায়ু শুধু জীবন দীর্ঘায়িত করার বিষয় নয়। এটি উদযাপনের বিষয়, যেখানে প্রজন্মের মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হয়।”
তাঁর সহযোগী ক্রিস্টাল বার্নেট তরুণদের ‘নানকুরুনাইসা’ নামে ওকিনাওয়ান দর্শন গ্রহণের আহ্বান জানান। যার অর্থ- “চিন্তা করো না, সুখী থাকো।” এ দর্শন ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনে সহায়ক হতে পারে।
প্রকৃতিকে পুনর্গঠনের নতুন চিন্তা-
জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জিন প্রকৌশল ব্যবহার করে প্রবাল প্রাচীর পুনর্গঠনের আলোচনা উঠে আসে ‘ওয়াইল্ড কামব্যাক: উইল উই ইঞ্জিনিয়ার নেচার রেজিলিয়েন্স ইন দ্য ফিউচার?’ শীর্ষক অধিবেশনে।
রিভাইভ অ্যান্ড রিস্টোরের ড. লিভ উইলিয়ামসন বলেন- “প্রবাল প্রাচীর সমুদ্র তলদেশের মাত্র ১% এলাকা জুড়ে রয়েছে কিন্তু এটি সমুদ্রের এক-চতুর্থাংশ জীববৈচিত্র্যের জন্য অপরিহার্য আশ্রয়স্থল। এটি উপকূলীয় এলাকাগুলোকে বন্যা ও ক্ষয় থেকে রক্ষার প্রাকৃতিক প্রাচীর হিসেবে কাজ করে।”
একই সঙ্গে ছত্রাকের পরিবেশগত ভূমিকা তুলে ধরা হয়। ছত্রাককে “রূপান্তরের আয়ত্তকারী” হিসেবে বর্ণনা করে বলা হয়, এটি পরিবেশের উপাদান ভেঙে নতুন জীবন সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
‘আর্থ’স চেকআপ’ শীর্ষক একটি অধিবেশনে সোমা মাটারের শেখ মজিদ সুলতান আল কাসিমি, প্ল্যানেট ল্যাবসের অ্যান্ড্রু জোলি এবং ড. জেমিলাহ মাহমুদ মানব ও গ্রহের স্বাস্থ্যের মধ্যে গভীর সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন।
“প্রকৃতি আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি। এটি শুধু জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে না, বরং মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্যও অপরিহার্য,” মন্তব্য করেন লায়লা আবদুল্লাতিফ।
দুবাই ফিউচার ফোরাম ২০২৪ শুধুমাত্র ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নয় বরং মানবজাতি, প্রকৃতি ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রাসঙ্গিকতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। বিশ্বের বিশেষজ্ঞদের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা ভবিষ্যতের টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য নতুন পথ উন্মোচন করতে পারে।

