গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের কিছু ভয়াবহ ঘটনা এবং সামগ্রিক পরিসংখ্যান নারী ও শিশু নির্যাতনের বর্তমান চিত্রটিকে আমাদের সামনে স্পষ্ট করে তুলেছে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দুটি ঘটনাই এ সংকটের মাত্রা বোঝাতে যথেষ্ট।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে গত ৯ আগস্ট দুই তরুণীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় ছয়জন আসামি ছিল। কিন্তু স্থানীয়দের সহযোগিতায় একজন গ্রেপ্তার হওয়া ছাড়া বাকিরা পুলিশের খাতায় ‘পলাতক’ রয়ে গেছে। একইভাবে ৭ সেপ্টেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ত্রাণের আশায় আসা ৬৫ বছর বয়সী এক নারী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। এই ঘটনার আসামিরাও অজ্ঞাতপরিচয় থেকে গেছে এবং এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০–এর ৯ (৩) ধারায় করা এ ধরনের মামলার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। পুলিশের তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২ হাজার ৭৬৯টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে নারী নির্যাতনের মামলা ১০ হাজার ৬৮৬টি। বাকিগুলো শিশু নির্যাতনের ঘটনা। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ২৪ হাজার ৩৩৯ জনকে, অথচ গ্রেপ্তার হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৮৩৫ জন। অর্থাৎ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসামি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
অগাস্ট-সেপ্টেম্বর: পরিস্থিতি আরো খারাপ-
জুলাই মাসে পুলিশ রাজনৈতিক সহিংসতা দমনে ব্যস্ত থাকায় থানায় নারী নির্যাতনের অনেক অভিযোগ গ্রহণ করা হয়নি। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থানা কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি হয়, যার প্রভাব আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে মামলার কার্যক্রমে স্পষ্ট।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে মামলা হয়েছে ৮৮৯টি এবং আসামি করা হয়েছে ২ হাজার ২৩৮ জনকে। গ্রেপ্তার হয়েছে মাত্র ৫৩০ জন। সেপ্টেম্বরে মামলা বেড়ে ১ হাজার ২৮৮টিতে পৌঁছায়, যেখানে আসামি করা হয় ২ হাজার ৯৮৬ জনকে কিন্তু গ্রেপ্তার হয় ৬১৭ জন।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, দলবদ্ধ ধর্ষণের মতো গুরুতর ঘটনায়ও মামলা করতে সময় লেগে যাচ্ছে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ঘটনায় মামলা হয় ঘটনার ২৩ দিন পর। এই বিলম্ব বিচার প্রক্রিয়াকে জটিল করছে।
ধর্ষণ ও অন্যান্য অপরাধের সামগ্রিক চিত্র-
২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে ৩ হাজার ৩৯৩টি। এর মধ্যে ২২৩টি দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণের পর ১২ জনকে হত্যা করা হয়েছে, আর ধর্ষণচেষ্টার মামলা হয়েছে ১ হাজার ৪২৬টি। যৌতুকের কারণে নির্যাতনের অভিযোগে ৩ হাজার ২০৮টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ১৩৬ নারী প্রাণ হারিয়েছেন। অপহরণ এবং দাহ্য পদার্থ নিক্ষেপের মামলার সংখ্যা যথাক্রমে ২ হাজার ৬১৭ ও ৪২টি।
আসামি গ্রেপ্তারে বড় প্রতিবন্ধকতা-
পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের এআইজি ইনামুল হক সাগর জানান, আসামিরা আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় গ্রেপ্তার কঠিন হয়ে পড়ে। তবে তিনি দাবি করেন, আসামি ধরতে পুলিশের তৎপরতায় কোনো ঘাটতি নেই।
তবে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, আসামি গ্রেপ্তার না হলে মামলা দীর্ঘায়িত হয়, যা ভুক্তভোগীদের জন্য বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অপরাধ বাড়ার সম্ভাবনাও থেকে যায়। তিনি ধর্ষণ, দাহ্য পদার্থ নিক্ষেপ, পাচার এবং পর্নোগ্রাফির মতো সংবেদনশীল মামলার জন্য পুলিশের আলাদা তদন্ত সেল গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ-
এমন প্রেক্ষাপটে আজ ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বিশ্ব মানবাধিকার দিবস পালিত হচ্ছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য, ‘নারী-কন্যার সুরক্ষা করি, সহিংসতামুক্ত বিশ্ব গড়ি’।
এমন প্রতিপাদ্য বাস্তবায়ন করতে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, আসামি গ্রেপ্তারের হার বাড়ানো এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রতিটি মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, অপরাধীরা থেকে যাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে, আর ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় ধুঁকতে থাকবে।

