পুরাতন হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন সম্প্রতি সংশোধিত আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। তিনি জানান, এ সংশোধনী ২০০৯ সাল থেকে কার্যকর ধরা হবে এবং যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের যেসব মামলা চলমান ছিল, সেগুলো নতুন আইনের আওতাতেই চলবে।
নতুন আইনের প্রধান পরিবর্তনসমূহ-
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সংশোধিত আইনটি গেজেট আকারে প্রকাশ করে। এতে উল্লেখযোগ্য কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, যার মাধ্যমে আইনটি আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী আরও শক্তিশালী ও সমসাময়িক করা হয়েছে।
আদালত প্রক্রিয়ায় ডিফেন্সের অধিক সুবিধা-
গাজী মোনাওয়ার জানান, আইন সংশোধনের ফলে আসামিপক্ষকে আরও প্রস্তুতির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আগে ডিফেন্সকে সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য তিন সপ্তাহ সময় দেওয়া হতো, যা এখন ছয় সপ্তাহে বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া প্রসিকিউশনের সব নথিপত্র ডিফেন্স চাহিদামতো আদালতের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে পারবে।
ডিফেন্সের সাক্ষী উপস্থাপনের ক্ষেত্রে শিথিলতা-
পূর্বে ডিফেন্সকে সব সাক্ষীর নাম বা তালিকা অভিযোগ শুনানির সময় আদালতে জমা দিতে হতো। সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, বিচারের যেকোনো পর্যায়ে ডিফেন্স সাক্ষী হাজির করতে পারবে।
আগে এই আইনে কেবল সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বিচার করা সম্ভব ছিল। সংশোধনের ফলে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, গোয়েন্দা সংস্থা ও আনসার বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেও একই আইন অনুযায়ী বিচার করা যাবে।
প্রসিকিউটর জানান, রাজনৈতিক দল বা সংগঠনকে বিচারের আওতায় আনতে এ আইনে কোনো বিধান রাখা হয়নি। এর জন্য দেশের অন্যান্য আইন প্রয়োগ করা হবে।
ন্যায়বিচার ও দ্রুততার নিশ্চয়তা-
আইন সংশোধনের ফলে বিচার প্রক্রিয়া বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রসিকিউটর বলেন, ‘‘যেন অযৌক্তিক বিলম্ব না হয়, সে বিষয়ে ট্রাইব্যুনালকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এতে বিচার কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করার নিশ্চয়তা থাকবে।’’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিচারের কোনো পর্যায়ে যদি প্রমাণিত হয় যে কোনো অভিযোগ সংশোধিত আইনের আওতায় পড়ে না, তাহলে তা নিয়মিত আদালতে পাঠানোর সুযোগও রাখা হয়েছে।
মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য-
গাজী মোনাওয়ারের মতে, সংশোধিত আইনটি আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। পুরনো আইনের যে দুর্বলতাগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠত, সেগুলোর সমাধান করে ন্যায়বিচারের নীতি নিশ্চিত করা হয়েছে।
পটভূমি: সংশোধিত আইন প্রণয়নের কারণ-
জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুম-খুনের মতো অপরাধের বিচারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে অন্তর্বর্তী সরকার এই আইন সংশোধন করেছে। সংশোধনীটি ২০২৪ সালে অধ্যাদেশ আকারে প্রকাশিত হয়।
প্রসিকিউটরদের বক্তব্য-
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ট্রাইব্যুনালের আরেক প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আল নোমান। তিনি গাজী মোনাওয়ারের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন এবং সংশোধিত আইন নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এই সংশোধনীর ফলে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা, কার্যকারিতা এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

