আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি, ডাকাতি ও নানা অপ্রীতিকর ঘটনা রোধে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে হাইওয়ে পুলিশ। এবারের ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি, যার আওতায় পশুবাহী ট্রাকগুলোতে বসানো হচ্ছে জিপিএস ট্র্যাকার ও ড্যাশ ক্যামেরা। একই সঙ্গে প্রতি ৮ থেকে ১০টি ট্রাকের সঙ্গে থাকবেন একজন করে পুলিশ সদস্য। এসব ট্র্যাকার ও ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাবে হাইওয়ে পুলিশের কেন্দ্রীয় মনিটরিং ইউনিট।
প্রতিবছরই কোরবানির মৌসুমে পথে পথে পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি, হাটে জোর করে ট্রাক প্রবেশ করানোর চেষ্টা এবং ডাকাতি কিংবা মলম পার্টি ও অজ্ঞান পার্টির আক্রমণের মতো ঘটনা ঘটে। এসব সমস্যা সমাধানে এ বছর প্রযুক্তিনির্ভর ও সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকেছে হাইওয়ে পুলিশ। নেয়া হয়েছে বেশ কিছু কার্যকর উদ্যোগ যার মধ্যে রয়েছে জিপিএস ট্র্যাকিং, ফড়িয়াদের তথ্যভিত্তিক ডেটাবেজ তৈরি, উন্নত ওয়েবসাইট চালু এবং মহাসড়কে টহল জোরদার।
হাইওয়ে পুলিশপ্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা জানান, পশুবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাসে জিপিএস সংযুক্ত ড্যাশ ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব ক্যামেরা কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত থাকবে ফলে হাইওয়ে পুলিশ যেকোনো দুর্ঘটনা বা অপরাধমূলক ঘটনার ত্বরিত ভিডিও ফুটেজ পেয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবে। চালকের মাদক সেবন, হেডফোন ব্যবহার বা বেপরোয়া চালনার বিষয়গুলোও মনিটরিংয়ের আওতায় থাকবে।
মহাসড়কের যানবাহন চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি বৈঠক করেছে পুলিশ। এবার সাধারণ নিরাপত্তার চেয়ে এগিয়ে গিয়ে প্রযুক্তি ও পরিকল্পনার সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
জানা গেছে, যেসব জেলা থেকে ঢাকায় পশু সরবরাহ হয়ে থাকে যেমন- চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, নওগাঁ, বগুড়া ও লালমনিরহাট সেসব অঞ্চলের ফড়িয়াদের তথ্যভিত্তিক ডেটাবেজ তৈরি করেছে হাইওয়ে পুলিশ। স্থানীয় প্রশাসন ও হাট পরিচালনা কমিটির সঙ্গে বৈঠক করে এসব জেলা ও হাট কেন্দ্রিক একটি সমন্বিত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব এলাকা থেকে ট্রাকে গরু লোড হওয়ার পর নির্ধারিত সময় ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে একযোগে ট্রাকগুলো গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছাড়বে। যা মহাসড়কে চাঁদাবাজি ও অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধে সহায়ক হবে।
গত ১০ মে হাইওয়ে পুলিশ একটি তথ্যসমৃদ্ধ ও প্রযুক্তিনির্ভর ইন্টারেকটিভ ওয়েবসাইট চালু করেছে। এ প্ল্যাটফর্মে হাইওয়ে থানা, সংশ্লিষ্ট থানা, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, রেস্টুরেন্ট, পেট্রোলপাম্প, ওয়ার্কশপ এবং গরুর হাটের জিও লোকেশনসহ প্রয়োজনীয় তথ্য থাকবে। ব্যবহারকারী তাদের অবস্থান অনুযায়ী রুট নির্দেশনা ও দূরত্ব জানতে পারবেন সহজেই।
হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে ঈদ উপলক্ষে গৃহীত অন্যান্য পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অস্থায়ী সাব-কন্ট্রোল রুম স্থাপন, দুর্ঘটনা বা যানজটের তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও প্রতিক্রিয়ার জন্য কুইক রেসপন্স টিম গঠন, মোটরসাইকেল টহল ডিউটি, রাতের বাসে ভিডিও চিত্র ধারণ এবং মহাসড়কের পাশের পশুর হাটগুলোর জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা। একইসঙ্গে হাইওয়ে পুলিশের ইন্টেলিজেন্স টিমও মহাসড়কে সক্রিয় থাকবে, যাতে ডাকাতি, চাঁদাবাজি বা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করা যায়।
পাশাপাশি, মহাসড়কে অবৈধ থ্রি-হুইলার চলাচল বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা, ঈদের আগে তিন দিন ট্রাক-লরি ও ভারী যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা এবং ঈদের আগে ও পরে সাত দিন অনুমতি ছাড়া কোনো যানবাহন থামানো বা চেক না করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে সমন্বয়ে কমিউনিটি পুলিশিং স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হবে। এ ছাড়া বেসরকারি রেকার ও ক্রেন প্রস্তুত রাখা, অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা এবং বাসস্ট্যান্ড ও বাজারে অতিরিক্ত জনসমাগমের স্থানে স্পেশাল টিম মোতায়েনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জেলা, মেট্রোপলিটন, নৌ ও শিল্প পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সব বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সুষ্ঠু নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (এইচআর অ্যান্ড মিডিয়া) মো. শামসুল আলম জানান, কোরবানির পশুবোঝাই ট্রাক নির্ধারিত হাট ব্যতীত কোথাও থামানো যাবে না। এ জন্য ট্রাকের সামনের অংশে হাটের নামসহ ব্যানার লাগাতে হবে। হাটে পৌঁছাতে এসব ট্রাককে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়া হবে। মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে থাকবে কন্ট্রোল রুম যা তাৎক্ষণিক সমস্যায় সাড়া দেবে। এ ছাড়া পশু ব্যবসায়ীদের জন্য নিরাপত্তা লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে যেখানে প্রতিটি থানা ও কন্ট্রোল রুমের যোগাযোগ নম্বর সংযুক্ত থাকবে।
এবারের ঈদ উপলক্ষে মহাসড়কে বা তার পাশে চিহ্নিত ২১৭টি সম্ভাব্য গরুর হাট ইজারা না দেওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে যানজট ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ করা যায়।
সব মিলিয়ে এবারের কোরবানির ঈদে পশু পরিবহন থেকে হাট পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির সঙ্গে মানবসম্পদের দক্ষ ব্যবহার করে একটি আধুনিক ও সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে হাইওয়ে পুলিশ। এর মাধ্যমে সবার জন্য একটি নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন কোরবানি ঈদ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

