সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ করে হত্যাচেষ্টার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় বিশিষ্ট সাংবাদিক শফিক রেহমানকে খালাস দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার (২৭ মে) ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ তারিক এজাজের আদালত এই রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় ৯০ বছর বয়সী শফিক রেহমান নিজে আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে গত ২৭ এপ্রিল আসামিপক্ষে অ্যাডভোকেট সৈয়দ জয়নুল আবেদীন মেজবাহ আদালতে শফিক রেহমানের খালাস চেয়ে শুনানি করেন। ওই শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ আদালতকে জানায়, এই মামলায় শফিক রেহমান খালাস পেলে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
আসামিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে আইনজীবী বলেন, এটি কথিত অপহরণ ও হত্যাচেষ্টার একটি রাজনৈতিক মামলা, যার বাদী ভিকটিম নিজে নন, বরং পুলিশ অতিরিক্ত আগ্রহ দেখিয়ে নিজ উদ্যোগে মামলা করে। মামলায় কোনো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেই। ১২ জন সাক্ষীর মধ্যে সজীব ওয়াজেদ জয় নিজেও আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। কিন্তু সাক্ষ্যগ্রহণের দিন আদালতে বিচারকের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আসামিপক্ষের আইনজীবী। তিনি বলেন, “যে দিন জয় সাক্ষ্য দেয়, সেদিন বিচারককে তার পেছনে দৌড়াতে দেখা যায়। এতে বোঝা যায়, বিচার কতটা স্বাভাবিক ও নিরপেক্ষ ছিল।”
রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মোহাম্মদ খলিলুর রহমান (খলিল) বলেন, মামলাটি ছিল রাজনৈতিক হয়রানিমূলক। শফিক রেহমান একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক হওয়ায় আদালত যদি তাকে খালাস দেন, তবে তাদের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি নেই।
মামলার পেছনের ঘটনা বিশ্লেষণে জানা যায়, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের আগে কোনো এক সময় থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাজ্য, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও এর নেতৃত্বাধীন জোটের উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন নেতা, বিশেষ করে জাসাসের (বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন) সহ-সভাপতি মোহাম্মদ উল্লাহ মামুন, সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যার ষড়যন্ত্র করেন বলে অভিযোগ ওঠে। রাজধানীর পল্টনের জাসাস কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে এসব পরিকল্পনা হয়েছে বলে মামলায় দাবি করা হয়।
এই ঘটনায় ২০১৫ সালের ৩ আগস্ট ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ফজলুর রহমান পল্টন মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। অভিযুক্তদের মধ্যে ছিলেন সাংবাদিক শফিক রেহমান, ‘আমার দেশ’ পত্রিকার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, জাসাস নেতা মোহাম্মদ উল্লাহ, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী রিজভী আহমেদ সিজার ও মিজানুর রহমান ভূঁইয়া।
২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামান নূরের আদালত এই পাঁচজনকে দণ্ডবিধির দুইটি ধারায় সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। ৩৬৫ ধারায় (অপহরণ) পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে এক মাসের কারাদণ্ড এবং ১২০(খ) ধারায় (ষড়যন্ত্র) দুই বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিচারক নির্দেশ দেন, দুই ধারার সাজা একসাথে চলবে।
এরপর ২০২৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে সাজাপ্রাপ্ত শফিক রেহমান ও যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী মিজানুর রহমান ভূঁইয়ার সাজা এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়। শফিক রেহমান পরে ৩০ সেপ্টেম্বর আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন এবং মামলার সাজার বিরুদ্ধে আপিল করেন। একই মামলায় ২০২৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ‘আমার দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান খালাস পান।
এই মামলায় সজীব ওয়াজেদ জয়সহ মোট ১২ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। তবে সাক্ষ্যপ্রমাণে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত শেষ পর্যন্ত সাংবাদিক শফিক রেহমানকে খালাস দেন।
এই রায়কে কেন্দ্র করে সাংবাদিক মহল ও মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও অনেকেই মনে করছেন, এটি স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার একটি উদাহরণ। একইসঙ্গে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার অপব্যবহার নিয়ে নতুন করে ভাবনার দরকার রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

