সাইবার অপরাধ দমন ও অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ নামে নতুন একটি আইনি কাঠামো চালু করেছে সরকার। তবে নতুন এই অধ্যাদেশ জারি করার মধ্য দিয়ে বাতিল করা হয়েছে বিতর্কিত ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩’। যদিও মানবাধিকারকর্মী ও প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে কিছু ইতিবাচক সংশোধন আনা হলেও পুরনো আইনের মতো কিছু বিতর্কিত ধারা বহাল রয়েছে বিশেষ করে পুলিশকে পরোয়ানা ছাড়া গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়া।
নতুন অধ্যাদেশের ৩৫ (ঘ) ধারায় বলা হয়েছে, যদি পুলিশ মনে করে কোনো ব্যক্তি এ আইনের আওতায় অপরাধে জড়িত কিংবা জড়িত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন তাহলে তাকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করা যাবে। যদিও এই ধারা পূর্ববর্তী আইনেও ছিল এবং তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো সমালোচনা করে আসছিল।
অবশ্য নতুন আইনে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকা নিয়ে সমালোচনা করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার ধারা (পুরনো আইনের ২১ ধারা) এখন আর নেই। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
নতুন অধ্যাদেশে সাইবার অপরাধের সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি যদি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোয় (Critical Information Infrastructure – CII) হামলা চালায়, তাহলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ১৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, এই অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় শাস্তি হতে পারে।
এছাড়া অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধ করার বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি জুয়ার অ্যাপ তৈরি, পরিচালনা, প্রচার করেন বা এতে অংশগ্রহণ করেন, তাহলে তাকে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, এক কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া হতে পারে।
নতুন অধ্যাদেশে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের দমন ও সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছু সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২(ল) ধারায় বলা হয়েছে, ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকারকে সাইবার সুরক্ষার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। একইসঙ্গে ব্যক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা টুল বা এজেন্টের অ্যাকসেসকেও এর আওতায় আনা হয়েছে। প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, এতে সরকারের নজরদারির ক্ষমতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে যা ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও অধিকারকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
অন্যদিকে ৫০(৪) ধারায় বলা হয়েছে, পূর্ববর্তী সাইবার নিরাপত্তা আইনের অধীনে বিচারাধীন ও তদন্তাধীন থাকা ৯টি ধারার সব মামলা বাতিল বলে গণ্য হবে। এমনকি আদালতের রায়ও কার্যকর হবে না। ফলে আগের আইনের অধীনে দায়ের হওয়া হাজারো মামলার অবসান ঘটবে এবং অনেক ভুক্তভোগী খানিকটা হলেও স্বস্তি পাবেন।
নতুন অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে প্রযুক্তিবিদ ফাহিম মাশরুর বলেন, “আমরা সব সময়ই পুলিশের বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতার বিরোধিতা করে এসেছি। যে খসড়া আমাদের দেখানো হয়েছিল তাতে এই ধারা ছিল না। হঠাৎ করে এটি অন্তর্ভুক্ত হলো কীভাবে তা বোধগম্য নয়।” তিনি আরও বলেন, “সাইবার সুরক্ষা অত্যন্ত জরুরি তবে সেটি যেন নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন না করে। বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করার ক্ষমতা বাস্তবে আইনের অপব্যবহারকে উৎসাহিত করতে পারে যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কাম্য নয়।”
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “অধ্যাদেশে কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে যেমন অপব্যবহারের সুযোগ কমানো ও বিতর্কিত ধারার অপসারণ। তবে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার, নজরদারি এবং জবাবদিহিহীনতার ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে। জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি পুরোপুরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকায় স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।”
এছাড়া অধ্যাদেশে গঠিত ২৫ সদস্যের সাইবার কাউন্সিলে মাত্র দুজন আইসিটি বা মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ থাকবেন যারা সরকার মনোনীত। ফলে এতে সরকারের বাইরে অংশীজনের যথাযথ প্রতিনিধিত্বের সুযোগ থাকবে না বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকারের পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব অবশ্য এসব আশঙ্কা খণ্ডন করে বলেন, “পুলিশের বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতা আগের মতো উন্মুক্ত নয়, বরং একে খুবই সীমিত করা হয়েছে। এটি কেবল কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো যেমন: সিআইআই-এর সাইবার হামলার মতো উচ্চঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। দেশে বর্তমানে এ ধরনের অবকাঠামো মাত্র ৩৫টি। লক্ষ্য একটাই সংবেদনশীল অবকাঠামোর নিরাপত্তায় দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা গড়ে তোলা বিশেষ করে আদালত অবকাশে থাকলে।”
তিনি আরও জানান, গ্রেফতার বা জব্দের প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আদালতে হাজির করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে, যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ একটি যুগোপযোগী প্রয়াস হলেও এর কিছু ধারা নিয়ে এখনও উদ্বেগ রয়েছে। নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং আইনের অপব্যবহার রোধে কার্যকর নজরদারি ও বাস্তব অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে স্বাধীনতা হুমকিতে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

