বাংলাদেশে পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যে আইনগত কাঠামো থাকলেও বাস্তবে ন্যায়বিচার পাওয়া এক কঠিন, জটিল ও নিরুৎসাহজনক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। দেশের ১৭ কোটি মানুষের জন্য রয়েছে মাত্র দুটি পরিবেশ আদালত একটি ঢাকায় এবং অপরটি চট্টগ্রামে। অথচ ২০১০ সালের পরিবেশ আদালত আইন অনুযায়ী, প্রতিটি জেলায় কমপক্ষে একটি করে পরিবেশ আদালত স্থাপনের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাস্তবতা হলো দীর্ঘ ২১ বছরেও এ আইন বাস্তবায়নের লক্ষণ নেই।
এই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন পরিবেশ অধিকারকর্মী সৈয়দ সাইফুল আলম শুভন এবং পরিবেশ আইনজীবী ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদের মতো অনেকে। নদী দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নামলেও তারা পড়েছেন প্রশাসনিক জটিলতা এবং আইনি নিষেধাজ্ঞার জালে। শুভন যখন বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণ ও দখলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে যান তখন তাকে সরাসরি আদালতে যাওয়ার সুযোগ না দিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে পাঠানো হয়। অভিযোগ জমা দেওয়ার পরও কোনো কার্যকর প্রতিকার পাননি তিনি। অন্যদিকে নিশাত মাহমুদ ২০১৭ সাল থেকে একাধিক পরিবেশবিষয়ক মামলা দায়েরের চেষ্টা করেও সফল হননি। বারবার প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে তারা নিরুৎসাহিত হয়ে ফিরে এসেছেন।
মূলত, ২০১০ সালের পরিবেশ আদালত আইন অনুযায়ী, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বা তাঁর অনুমোদিত ব্যক্তির বাইরে কেউ আদালতে মামলা করতে পারেন না। এমনকি আদালতও কোনো অভিযোগ গ্রহণ করতে পারে না যদি না তা অধিদপ্তরের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে আসে। এর ফলে আদালতের নিজের উদ্যোগে কোনো মামলাও গ্রহণ করার সুযোগ নেই যা বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও দুরূহ করে তুলেছে।
এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ জনগণের আদালতে যাওয়ার অধিকার কার্যত বাতিল হয়ে গেছে। এমনকি যাঁদের আইনি দক্ষতা ও আগ্রহ আছে, তাঁরাও হতাশ হয়ে পড়ছেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের সীমিত জনবল, বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত পরিদর্শকের অভাব এবং জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়া পুরো সিস্টেমকে অকার্যকর করে তুলেছে।
বর্তমানে কার্যকর দুটি আদালত ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এরপর আর কোনো নতুন আদালত গঠিত হয়নি। গত দুই দশকে সারা দেশে পরিবেশ আদালতে মোট ৬৭৩টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ২০৭টি নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকিগুলো বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে। অথচ একই সময়ে হাইকোর্টে পরিবেশ সংক্রান্ত রিট মামলা হয়েছে দুই হাজারেরও বেশি যা স্পষ্ট করে যে মানুষ বিকল্প পথেই ন্যায়বিচারের খোঁজ করছে।
অনেকে ভুলভাবে মনে করেন যে সিলেটেও একটি পরিবেশ আদালত রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে সেটি বর্তমানে অকার্যকর অবস্থায় আছে। ফলে দেশের বিভিন্ন জেলার জনগণকে ন্যায়বিচারের জন্য ঢাকার বা চট্টগ্রামের আদালতের দ্বারস্থ হতে হয় যা তাদের জন্য অর্থনৈতিক, মানসিক এবং সামাজিকভাবে কঠিন এক বাস্তবতা।
পরিবেশ কর্মীরা বলছেন, এই সংকট নিরসনে পরিবেশ আদালত আইন সংশোধন অত্যাবশ্যক। জনগণের সরাসরি আদালতে যাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তারা আরও বলছেন, তদন্তের দায়িত্ব পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে দেওয়া, প্রতিটি জেলায় পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠা, বিচারকদের পরিবেশ বিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ ছাড়া কোনোভাবেই এই কাঠামো কার্যকর করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধিও এ প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মূলত, পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশ-সংক্রান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমানে যে কাঠামো চালু আছে তা সে উদ্দেশ্যকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দিচ্ছে। বিচারব্যবস্থা থেকে জনগণ দূরে থাকলে অপরাধীরা উৎসাহিত হবে এবং পরিবেশ সুরক্ষা আরও হুমকির মুখে পড়বে। তাই এখনই সময় আইনি কাঠামো সহজ, কার্যকর ও জনগণের নাগালে আনার। তা না হলে পরিবেশবিচারের এই ব্যবস্থাটি শুধুই আইনের পাতায় বন্দি থেকে যাবে বাস্তব জীবনে নয়।

