প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেছেন, জাতির বিবেক জাগ্রত হয়েছিল ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে, যখন অন্যায়, দুর্নীতি ও নিপীড়ন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। সে সময় বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠান যেন কেবল একটি গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় নিয়োজিত ছিল। নিপীড়িত মানুষের আর্তনাদ আদালতের রায়ের চেয়েও জোরালো হয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল আর সেই অবস্থায় জনগণ ন্যায়বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছিল।
তিনি বলেন, “ঢাকার প্রতিটি চত্বরে, শাহবাগ ও শহীদ মিনারের প্রাণকেন্দ্রে তরুণদের কণ্ঠে একক ও দৃঢ় চিৎকার উঠেছিল ‘আমরা ন্যায়বিচার চাই’। এটি কোনো স্লোগান ছিল না বরং এটি ছিল আদালতের বাইরের একটি জনগণের রায়।”
বুধবার (২৮ মে) রাজধানীর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণের শহীদ শফিউর রহমান মিলনায়তনে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াডহ্যাম কলেজ থেকে আজীবন সম্মানসূচক ফেলোশিপ অর্জনের উপলক্ষে আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে প্রধান বিচারপতিকে এই সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, সাবেক স্পিকার ও বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার এবং সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি জয়নুল আবেদীন। সভাপতিত্ব করেন সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন এবং অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বারের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহফুজুর রহমান মিলন।
প্রধান বিচারপতি তার বক্তব্যে আরও বলেন, “নৈতিক স্বচ্ছতার সেই অভ্যুত্থান এমন একটি শাসনব্যবস্থার পতনের সূচনা করেছিল যারা আইনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ন্যায়বিচারের সঙ্গে আপস করেছিল। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিচার বিভাগকেও রেহাই দেওয়া হয়নি। বিচারিক বৈধতার ভিত্তিগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল। অথচ যাদের কাজ জনগণের সেবা করা তাদের মাধ্যমেই এসব ঘটেছিল।”
তিনি তার নিজের নিয়োগ প্রসঙ্গে বলেন, “আমার নিয়োগ কোনো আনুষ্ঠানিক পদোন্নতি নয় এটি একটি গৌরবময় মতামতের প্রতিফলন। আমি দুর্ঘটনাক্রমে নির্বাচিত হইনি বা কেবল মর্যাদার কারণে নিযুক্ত হইনি। আমাকে ডেকেছিল জনগণের সেই নৈতিক শক্তি, যারা চেয়েছিল একটি সাহসী, সত্যনিষ্ঠ এবং জবাবদিহিমূলক বিচার বিভাগ।”
তিনি আরও বলেন, “এই সম্মান কেবল একজন বিচারকের ব্যক্তিগত অর্জন নয় বরং এটি সেই জাতির জন্য যারা স্বৈরাচার নয়, বরং ন্যায়বিচারকে বেছে নিয়েছে প্রতারণার পরিবর্তে সত্য এবং নীরবতার বদলে সংস্কারের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।”
প্রধান বিচারপতির বক্তব্যে উঠে আসে একটি দায়িত্বশীল ও গণমুখী বিচার ব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষা, যেখানে বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চাপমুক্ত, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক এক স্তম্ভ হিসেবে কাজ করবে। সংবর্ধনার মুহূর্তে জাতি, আইনজীবী সমাজ এবং বিচার বিভাগের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি শুধু উপলব্ধির নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্যও একটি শক্তিশালী বার্তা।

