ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়ে উত্তেজনা এখন নতুন এক মোড়ে পৌঁছেছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালত তার ‘লিবারেশন ডে’ নামে পরিচিত শুল্ক পরিকল্পনাকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইনি ক্ষমতা ছাড়াই এমন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা সংবিধান লঙ্ঘন করে। বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় হোয়াইট হাউজের জন্য বড় এক ধাক্কা, যা ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যনীতি বাস্তবায়নকে আরও কঠিন করে তুলবে।
আদালতের বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রাম্প যে জরুরি ক্ষমতা আইনের (ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার্স অ্যাক্ট) আওতায় বিশ্বব্যাপী শুল্ক বসিয়েছেন, তাতে তার আইনগত কোনো অধিকার ছিল না। বিশেষ করে গত জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর ট্রাম্প নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে ব্যাপক হারে আমদানির ওপর শুল্ক বসানো শুরু করেন। তার নীতিমালায় বলা হয়েছিল, সব আমদানির ওপর ১০ শতাংশ হারে শুল্ক বসবে এবং চীনের ওপর রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বাড়িয়ে ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল। যদিও বেশ কিছু শুল্ক স্থগিত রেখে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনার পথে হাঁটছিল হোয়াইট হাউজ।
আদালতের এই রায় যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেট প্রতিষ্ঠান, কংগ্রেসের বিরোধীপক্ষ এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই এর প্রভাব পুঁজিবাজারে পড়েছে। মার্কিন এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার সূচক বেড়েছে ১.৫ শতাংশ, ইউরোপের ইউরো স্টক ৫০ সূচক বেড়েছে ১ শতাংশ, জাপানের নিক্কেই সূচক ১.৮ শতাংশ, হংকংয়ের হ্যাং সেং এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচকও বেড়েছে। এমনকি ডলারের মানও বেড়েছে ০.৩ শতাংশ।
এই রায় দুটি মামলার ভিত্তিতে এসেছে। একটি দায়ের করেছিল ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি জোট, অন্যটি ১২টি মার্কিন অঙ্গরাজ্য মিলে, যার নেতৃত্বে ছিল ওরেগন। আদালতের মতে, প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশগুলো আইন পরিপন্থী এবং তিনি নিজের ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গেছেন।
এই রায়ের প্রতিক্রিয়ায় হোয়াইট হাউজ বলেছে, তারা আপিল করবে। প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র বলেন, কীভাবে জাতীয় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হবে, তা আদালত নির্ধারণ করতে পারে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছেন এবং সেই লক্ষ্যে তার সব নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করবেন।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা রায়টিকে স্বাগত জানিয়েছে। ওরেগনের সিনেটর রন ওয়াইডেন বলেন, ট্রাম্পের শুল্কনীতি সংবিধান বিকৃত করেছে। এতে পণ্যের দাম বেড়েছে, সরবরাহব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটেছে এবং ছোট-বড় ব্যবসাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আদালতের বিচারক জেন রেস্টানি বলেন, শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্টকে আইনের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া যায় না।
ট্রাম্পপন্থী আইনজীবীরা দাবি করেছিলেন, শুল্ক ঘোষণার পর অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে বসেছে। তবে বিচারক বলেছেন, এটি আদালতের বিবেচনার বিষয় নয়। সংবিধান অনুযায়ী, শুল্ক নির্ধারণের অধিকার কংগ্রেসের, প্রেসিডেন্টের নয়।
আইইইপিএ-এর আওতায় ট্রাম্প যুক্তি দিয়েছিলেন, আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্যহীনতা এবং বিদেশি নীতির প্রভাবে মার্কিন শ্রমবাজার হুমকির মুখে পড়েছে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অস্বাভাবিক ও গুরুতর হুমকি। কিন্তু এখন এসব পদক্ষেপ স্থগিত রাখা হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েনের সঙ্গে আলোচনার পর ইউরোপের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক ৯ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। চীনের সঙ্গে ৯০ দিনের জন্য শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। যদিও মোবাইল ও ইলেকট্রনিক পণ্যে শুল্ক এখনো বহাল রয়েছে, তবে ট্রাম্প জানিয়েছেন, এটিও অস্থায়ী।
এদিকে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সতর্ক করে বলেছে, ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপদ বিনিয়োগের ভাবমূর্তি ঝুঁকিতে পড়েছে, যা অর্থনীতির জন্য দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটির বৈঠকে জানানো হয়, শুল্ক আরোপের ফলে ডলার, স্টক এবং ট্রেজারি বন্ডের দাম একসঙ্গে পড়ে গেছে—যা অতীতে হয়নি।
কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের পরিচালক ফিলিপ সোয়াজেল বলেছেন, যদি আন্তর্জাতিক মূলধন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরে যায়, তাহলে তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমাবে, চাকরির বাজার সংকুচিত করবে এবং সরকারকে আরও বেশি সুদে ঋণ নিতে হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আদালতের এই রায় শুধু ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক ও আইনি চ্যালেঞ্জ নয়—এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং বিশ্ববাণিজ্যের ভারসাম্যের ওপরও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।

