বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের নিবন্ধন ফিরে পেতে দীর্ঘদিন ধরে চলা আইনি লড়াইয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পৌঁছেছে। রোববার ১ জুন ২০২৫ তারিখে, প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির একটি আপিল বেঞ্চ এ মামলার রায় ঘোষণা করবেন। ইতোমধ্যেই মামলাটি আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় শীর্ষে রাখা হয়েছে যা রায়ের তাৎপর্য ও অগ্রাধিকারকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে।
শনিবার ৩১ মে, জামায়াতে ইসলামী পক্ষের অন্যতম আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির সাংবাদিকদের জানান, “ইনশাআল্লাহ আগামীকাল সকালে জামায়াতের নিবন্ধন মামলার রায় ঘোষণা করবেন আপিল বিভাগ।”
এর আগে ১৪ মে, দলটির নিবন্ধন এবং দলীয় প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ ফিরে পেতে করা আপিলের ওপর শুনানি শেষ হয় এবং রায়ের জন্য ১ জুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়। সেদিন আদালতে জামায়াতের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার এহসান আবদুল্লাহ সিদ্দিক, যাকে সহযোগিতা করেন ব্যারিস্টার ইমরান আবদুল্লাহ সিদ্দিক, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির ও ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন।
শুনানিকালে আদালত কক্ষে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন দলটির ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মাছুম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জোবায়ের, অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল, নির্বাহী পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ ও মোবারক হোসেন। এছাড়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল, উত্তরের আমির মো. সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিনও উপস্থিত ছিলেন।
এই আইনি প্রক্রিয়ার সূত্রপাত ঘটে গত বছরের ২২ অক্টোবর, যখন আপিল বিভাগ রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল সংক্রান্ত খারিজ হওয়া আপিল পুনরুজ্জীবিত করেন। এর ফলে দলটি নিবন্ধন ও দলীয় প্রতীক ফিরে পাওয়ার নতুন সুযোগ লাভ করে। এরপর ১২ মার্চ ২০২৫ তারিখ থেকে শুরু হয় মূল আপিল শুনানি।
প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চের আদেশে, জামায়াতের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার এহসান এ. সিদ্দিকী ও অ্যাডভোকেট শিশির মনির। রিটকারির পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড আলী আজম। এর আগে ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর আপিল শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছিলেন চেম্বার বিচারপতির আদালত, যেখানে জামায়াতের পক্ষে শুনানি করেন শিশির মনির।
উল্লেখ্য, জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করে হাইকোর্ট ২০১৩ সালের ১ আগস্ট একটি রায়ে দলটিকে অবৈধ ঘোষণা করে। এই রায়ের ভিত্তিতে ২০১৮ সালের ৭ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী আপিল করে কিন্তু মূল আইনজীবীর অনুপস্থিতিতে ২০২৩ সালের নভেম্বরে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন ছয় বিচারপতির আপিল বিভাগ ‘ডিসমিস ফর ডিফল্ট’ বলে আপিল খারিজের আদেশ দেন। ফলে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল থাকে এবং জামায়াতের রাজনৈতিক দল হিসেবে বৈধতা বাতিল হয়।
এদিকে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ সংশ্লিষ্ট অঙ্গসংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮(১) ধারা অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। তবে একই বছরের ২৮ আগস্ট ওই নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে নতুন একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
রোববারের রায় কেবল একটি দলের নিবন্ধন সংক্রান্ত নয় এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও আইনের শাসন সম্পর্কেও এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

