১২ হাজার ভরি স্বর্ণ আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় প্রথমে অভিযুক্ত হলেও অজানা কারণে চার্জশিট থেকে বাদ পড়েছিলেন বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন আহমেদ ওরফে মহি। পরে পটপরিবর্তনে বিষয়টি পুনরায় আলোচনায় এলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার ও তার স্ত্রীর সম্পদ অনুসন্ধানে নামে।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে, মহিউদ্দিন আহমেদ ও তার স্ত্রী নূরজাহান বেগম প্রায় চার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন এবং এসব সম্পদের উল্লেখযোগ্য অংশের তথ্য গোপন করেছেন। এরই প্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর দুদক তাদের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করে।
মামলার তদন্তে দুদক চলতি বছরের ২ জুন তাদের বক্তব্য শুনতে তলব করলেও মহিউদ্দিন আহমেদ ও তার স্ত্রী তাতে সাড়া দেননি। প্রথম মামলার এজাহার অনুযায়ী, মহিউদ্দিন আহমেদ দুদকে জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ মিলিয়ে মোট তিন কোটি ৯৭ লাখ ৭৯ হাজার ৩৩৩ টাকার সম্পদের ঘোষণা দেন। যাচাইকালে এক লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের প্রমাণ মেলে। পাশাপাশি জ্ঞাত আয়ের বাইরে আরও দুই কোটি ৭০ লাখ ৬৩ হাজার ৯৮ টাকার সম্পদের খোঁজ পায় দুদক।
অপর মামলায় দেখা যায়, নূরজাহান বেগমের ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ এক কোটি ৩৩ লাখ ৬১ হাজার ৭৭৫ টাকা হলেও এর মধ্যে ১৪ লাখ ৭০ হাজার ৫৬৫ টাকার সম্পদের তথ্য তিনি গোপন করেন। অনুসন্ধানে দুদক জানতে পারে, তার নামে এক কোটি ১৯ লাখ ৬৪ হাজার ৮০২ টাকার জ্ঞাত আয়ের বাইরে অর্জিত সম্পদ রয়েছে। এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি দায়ের করা স্বর্ণ আত্মসাতের মামলার পেছনের ঘটনাপ্রবাহও ছিল জটিল। ২০১০ সালে নারায়ণগঞ্জ কো-অপারেটিভ ক্রেডিট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান সমবায় ব্যাংক থেকে ১২ কোটি টাকা ঋণ নেয়, যার বিপরীতে জামানত রাখা হয় ১২ হাজার ভরি স্বর্ণ। সময়ের ব্যবধানে এই ঋণের সুদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ কোটি টাকায়। তবে ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয় প্রতিষ্ঠানটি এবং একপর্যায়ে দেউলিয়া হয়ে পড়ে। এই সুযোগে ব্যাংকের ভেতরের একটি চক্র জামানত রাখা স্বর্ণের নয়ছয় করে।
এ বিষয়ে ২০২০ সালেই তদন্তে নামে দুদক এবং প্রাথমিকভাবে মহিউদ্দিন আহমেদসহ নয়জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পায়। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও বাদ যান চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ। এমনকি, পরবর্তী চার্জশিটেও তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যদিও তখন তিনি ব্যাংকের কার্যক্রমে সর্বোচ্চ ক্ষমতা ও প্রভাবশালী ভূমিকায় ছিলেন।
২০২৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার কোটবাড়িতে একটি অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফ এই স্বর্ণ আত্মসাতের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “সমবায় ব্যাংকের অবস্থা পর্যালোচনা করে আমি ১২ হাজার ভরি স্বর্ণ আত্মসাতের তথ্য জানতে পেরেছি। বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এই ঘোষণার পরপরই দুদক নতুন করে সক্রিয় হয় এবং মহিউদ্দিন দম্পতির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। বর্তমানে তারা আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে জানতে মহিউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
দুদকের তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপের ফলে আলোচিত এ ঘটনার বিচারপ্রক্রিয়া কতদূর অগ্রসর হয়, তা এখন সময়ের অপেক্ষা। তবে এ ঘটনায় দায়মুক্তির প্রশ্নে যে জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল, তা আর অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই।

