গোপালগঞ্জে এনসিপির পদযাত্রা কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনায় সন্ত্রাস দমন আইনে গোপালগঞ্জ সদর ও কাশিয়ানী থানায় দুটি মামলা এবং কোটালীপাড়া থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা করা হয়েছে। সদর ও কাশিয়ানী থানার দুই মামলায় মোট ৯৪৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
অপরদিকে, কোটালীপাড়া থানার মামলায় ১ হাজার ৫৫৫ জন আওয়ামী লীগ ও সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নতুন করে আরও ১৩১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এ পর্যন্ত জেলায় মোট গ্রেপ্তার হলো ১৭৬ জন। সংঘর্ষ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আবারও কারফিউর সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। গতকাল শুক্রবার (১৮ জুলাই) সন্ধ্যা ৬টা থেকে শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ বলবৎ থাকবে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিহত রমজানের ভাই হীরা মুন্সী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, রমজান পেশায় রিকশাচালক ছিলেন। সংঘর্ষের দিন বুধবার দুপুরে চৌরঙ্গী কোর্টের সামনে যাওয়ার পথে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু হয়েছিল। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় রাতেই ঢামেকে নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রমজান মারা যান। গুলিবিদ্ধ সুমন বিশ্বাস (৩০) ও আব্বাস আলী (৩০) এখন ঢামেকে চিকিৎসাধীন।
গত বুধবার সংঘর্ষে ৪ জন নিহত হয়েছেন। তারা হলেন, কোটালীপাড়ার হরিণাহাটি গ্রামের কামরুল কাজীর ছেলে রমজান কাজী (১৯), থানাপাড়ার সোহেল রানা (৩৫), উদয়ন রোডের সন্তোষ সাহার ছেলে দীপ্ত সাহা (৩০) ও সদর উপজেলার ভেড়ার বাজার এলাকার ইমন তালুকদার (২৪)। পরিবার অভিযোগ করেছে, তারা পুলিশ গুলিতে নিহত হয়েছেন। হাসপাতালে জানা গেছে, মৃতদের দেহে গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে।
গোপালগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মীর সাজেদুর রহমান জানান, এনসিপির সমাবেশে হামলার ঘটনায় সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা হয়েছে। গোপীনাথপুর পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক আহম্মেদ আলী বিশ্বাস বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে মামলা করেন। এতে নিষিদ্ধ ঘোষিত জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নিউটন মোল্লা, সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান পিয়ালসহ ৭৫ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত ৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলা নম্বর ১৫। অভিযোগে বলা হয়েছে, পদযাত্রার সময় পুলিশের গাড়ি পুড়িয়ে, ভাঙচুর ও হামলা চালানো হয়। এতে গোপালগঞ্জে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
কাশিয়ানী থানায় করা মামলায় ৭০ জনের নাম উল্লেখ ও ৩০০ জন অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। ওসি জানান, পদযাত্রার সময় পুলিশ দায়িত্বে ছিলেন। নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানের নেতৃত্বে একদল লোক হঠাৎ পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। তারা মারপিট ও গাড়ি ভাঙচুর করে অগ্নিসংযোগ করে। পুলিশ পরিদর্শক আহম্মেদ আলী বিশ্বাসসহ ৫ জন আহত হন।
কোটালীপাড়া থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ জানান, শুক্রবার এসআই উত্তম কুমার সেন বাদী হয়ে ১ হাজার ৫৫৫ জনের নাম উল্লেখ ও ১ হাজার ৪০০ জন অজ্ঞাতকে আসামি করে মামলা করেন। এ পর্যন্ত ১২ জন গ্রেপ্তার হয়ে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি ছিল। পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়, তাই শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ বাড়ানো হয়েছে। জরুরি সেবা ও গণমাধ্যমকর্মীরা কারফিউর আওতার বাইরে থাকবেন। সংঘর্ষের ঘটনায় জেলায় অভিযান চালিয়ে নতুন করে ১১৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মোট গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৬৪ জন। সদর থানায় ৪৫, মুকসুদপুরে ৬৬, কাশিয়ানীতে ২৪, টুঙ্গিপাড়ায় ১৭ ও কোটালীপাড়ায় ১২ জন রয়েছে। তারা আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
শুক্রবার জেলা শহরে কারফিউয়ের দ্বিতীয় দিন ছিল। সকাল থেকে চাপা আতঙ্ক নিয়ে মানুষ বের হচ্ছেন। দিনমজুররা জীবন রক্ষার তাগিদে কাজের খোঁজে বের হচ্ছেন। শহরের সব দোকান-ব্যবসা বন্ধ। বিভিন্ন স্থানে পুলিশ টহল দিচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাতভর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আস্তে আস্তে কমছে।
ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে ফল-সবজির ব্যবসায়ীরা। দোকান বন্ধ থাকার কারণে পণ্য পচে যাচ্ছে। শহরের বড় বাজারের ফল ব্যবসায়ী উত্তম কুমার বলেন, ‘কারফিউতে দোকান বন্ধ থাকায় তিন দিনে প্রায় ৩০ হাজার টাকার পণ্য নষ্ট হয়েছে। আজ মাত্র তিন ঘণ্টা দোকান খুলেছি, বিক্রি কম হওয়ায় বাকি পণ্যও পচে যাবে। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া চাই।’
গোপালগঞ্জে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান চলছে। নদীপথে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী টহল জোরদার করেছে। কোস্টগার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার হারুন-অর-রশীদ বলেন, ‘ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দুষ্কৃতকারীরা নদীপথে পালিয়ে যেতে না পারে, তাই তল্লাশি ও যাত্রী পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে।’
গত বুধবার গোপালগঞ্জে এনসিপির পদযাত্রা ও পথসভা ভণ্ডুল করতে আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের শত শত নেতা-কর্মী হামলা চালায়। পরে তারা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। দিনে চলা সংঘর্ষে ৪ যুবক নিহত ও পুলিশ, সাংবাদিকসহ শতাধিক আহত হয়েছেন।

