ঢাকার আদালতে ১ লাখ ২০ হাজার চেক বাউন্স মামলার জট। ২০১৮ সালে মামলাটি করেন মঈন রায়হান নোমান। তিনি ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার চেক বাউন্স মামলায় দ্রুত বিচার চান। তবে সাত বছর পার হলেও কোনো প্রগতি হয়নি।
প্রতি বার শুনানির দিন আদালতে হাজির হন নোমান। শুনানি শেষে বাড়ি ফিরেন হতাশার সঙ্গে। বিচার চলে বছরের পর বছর তবু কোনো রায় নেই। তিনি অপেক্ষায় রয়েছেন পরবর্তী শুনানির তারিখের জন্য। নোমান বললেন, “সময় ও টাকা দুটোই নষ্ট হয়েছে। শুধু শুনানির তারিখ বাড়ছে, আর কিছু নয়।”
প্রথম দুই বছর মামলা চলে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। পরে মামলাটি স্থানান্তরিত হয় ট্রায়াল কোর্টে। এখন চলছে জয়েন্ট মেট্রোপলিটন সেশন্স জজ কোর্টে। তবে এখানে নতুন সমস্যা, তিনি পেলেন বছরে মাত্র একবার শুনানি। তার মধ্যে আসামি অসুস্থ থাকলে বা বিচারক ছুটিতে থাকলে পুনরায় স্থগিত হয় মামলা।
সাত বছরে সাক্ষীদের কথাও শেষ হয়নি। নোমান বলেন, “আর কত সময় লাগবে জানি না। ধৈর্য্যও ফুরিয়ে আসছে। এমন চলতে থাকলে হয়তো একদিন ন্যায় পাওয়ার আশা ছেড়ে দিতে হবে।” আদালতের তথ্য মতে, ঢাকায় বর্তমানে ৮টি জয়েন্ট মেট্রোপলিটন সেশন্স জজ কোর্টে চেক বাউন্স মামলা চলছে।
এই ৮টি কোর্টে মোট প্রায় ১,২০,০০০ বকেয়া মামলা জমা রয়েছে। প্রতিটি কোর্টে প্রায় ১৫ থেকে ১৭ হাজার মামলা বিচারাধীন। প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ মামলা শুনানি হয়। চেক মামলার সঙ্গে আরও নানা মামলা এখানে থাকে। ঢাকার জয়েন্ট সেশন্স কোর্টগুলোর চেক বাউন্স মামলার বকেয়া পরিমাণ — ১ম কোর্টে ১৬,৬৯০, ২য় কোর্টে ১৪,৮৬৬, ৩য় কোর্টে ১৭,২৬৯, ৪র্থ কোর্টে ১৩,৮৪৪, ৫ম কোর্টে ১৬,০৯৩, ৬ষ্ঠ কোর্টে ১৭,২০৬ এবং ৭ম কোর্টে ১৪,৮৮৯ মামলা।
পরিবেশ আদালতেও রয়েছে ১০,০০০ এর বেশি চেক বাউন্স মামলা। ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে এসব মামলা ধাপে ধাপে জয়েন্ট সেশন্স কোর্টে স্থানান্তর করা হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে একাই ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে ১২,০০০ নতুন মামলা এসেছে। তবে নতুন মামলার সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তার চেয়ে দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে না। ফলে বকেয়া মামলা ক্রমেই বাড়ছে।
ফরহান হোসেন, যিনি ৫ লাখ টাকার চেক বাউন্স মামলার অংশগ্রহণকারী, বলেন মামলাটি ৯ বছর ধরে বিচারাধীন, এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। তিনি বললেন, “আদালতে আসার কোনো লাভ নেই। সময় ও অর্থ দুটোই নষ্ট হয়। বিচারালয়ে নানা রকম হয়রানি হয়। শেষ শুনানি পৌঁছালে আসামি নতুন নতুন অজুহাত খুঁজে বিচার বিলম্ব করে।” ফরহান আরও বলেন, “কোর্ট বছরে মাত্র একদিন শুনানি দেয়। দশবার শুনানি পেতে চাইলে দশ বছর অপেক্ষা করতে হবে।” তিনি যোগ করেন, “যদি বিচার ব্যবস্থা এভাবেই থাকে, তাহলে ন্যায়বিচারের চেয়ে হয়রানিই বেশি হবে।”
ঢাকা মেট্রোপলিটন জয়েন্ট সেশন্স জজ কোর্ট-৭ এর একজন কর্মকর্তা নাম বলেন, তাদের আদালতে প্রায় ১৮ হাজার চেক মামলার বিচার চলছে। এর মধ্যে অনেক মামলার বয়স ১৫ বছর। তিনি বললেন, “বিচার খুব ধীরগতিতে হচ্ছে। বছরে একবার শুনানি পাওয়া দুষ্কর। সাধারণত ১০-১১ মাস পর আবার শুনানি হয়। দেরির প্রধান কারণ আদালতের সংখ্যা ও জনবল কম থাকা।”
ঢাকা অতিরিক্ত জয়েন্ট মেট্রোপলিটন সেশন্স জজ কোর্ট-১ এর অতিরিক্ত পিপি রেহানা পারভীন জানান, ২০০৫ সালের আগে চেক মামলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চলত। ২০২০ সালে হাইকোর্টের নির্দেশে এসব মামলা জয়েন্ট জেলা ও সেশন্স জজ কোর্টে স্থানান্তরিত হয়। তিনি বলেন, “মামলার সংখ্যা বাড়লেও আদালতের সংখ্যা বাড়েনি। তাই এত বড় বকেয়া হয়েছে। এতে আপাতদৃষ্টিতে মামলাকারী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।”
ঢাকা মেট্রোপলিটন জয়েন্ট সেশন্স জজ কোর্ট-৫ এর অতিরিক্ত পিপি মোঃ সাচ্ছু মিয়া একই কথা বলেন। তিনি সতর্ক করেন, “যদি নতুন জয়েন্ট কোর্ট না দেয়া হয়, মামলার পরিমাণ আরও বাড়বে।” তিনি সরকারের কাছে দ্রুত বিচার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

