অন্তর্বর্তী সরকার ১২৭ বছরের পুরনো ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ সালে প্রণীত আইনে বড় ধরনের সংশোধনী এনেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী এখন মুঠোফোন কল ও এসএমএসের মাধ্যমে সমন জারি করা যাবে। মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলা রোধে বাধ্যতামূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে।
সংশোধিত বিধানগুলোতে গ্রেপ্তার, তদন্ত, জামিন ও বিচার প্রক্রিয়ায় মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। বিচারপ্রার্থী ও আসামিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নতুন ধারা সংযুক্ত হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষমতা, পুলিশের রিমান্ড, অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো, মামলার হাজিরা ও সাক্ষীর নিরাপত্তা সম্পর্কেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এছাড়া সংক্ষিপ্ত বিচার আদালত পরিচালনার সুবিধাও যুক্ত হয়েছে।
৫৪ ধারা অনুযায়ী শুধু প্রতিরোধমূলক আটক করা যাবে না। পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে পুলিশ বাধ্য যে, গ্রেপ্তারের কারণ গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে জানাতে হবে। গত রোববার আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ সংশোধনী বিষয়ক গেজেট প্রকাশ করেছে।
গ্রেপ্তার ও সুরক্ষা: নতুন বিধানে গ্রেপ্তারকালে আসামি ও আশপাশের লোকদের গ্রেপ্তারকারীর পরিচয় জানাতে হবে। বাসার বাইরে গ্রেপ্তার হলে ১২ ঘণ্টার মধ্যে পরিবারের সদস্য, আত্মীয় বা মনোনীত বন্ধুকে সময়, স্থান ও কোথায় রাখা হবে তা জানাতে হবে। গ্রেপ্তার পর তা থানার জেনারেল ডায়েরিতে (জিডি) নথিভুক্ত করতে হবে। পুলিশের সামনেই অপরাধ প্রমাণ না হলে কেউ বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করা যাবে না।
আদালত ও পুলিশের ক্ষমতা: গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিকে আদালতে আনা হলে ম্যাজিস্ট্রেট সর্বাধিক ১৫ দিনের হেফাজতের অনুমতি দিতে পারবেন। তার বেশি হলে বিচারিক হেফাজত দেওয়া হবে। হেফাজতের মেয়াদ শেষ হলে অভিযুক্তকে দ্রুত ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে। নির্যাতনের অভিযোগ থাকলে মেডিকেল পরীক্ষা করানো হবে।
অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটকে ডায়েরির কপি দিতে হবে এবং অভিযুক্তকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। যদি বেআইনিভাবে গ্রেপ্তার দেখানোর অভিযোগ থাকে, ম্যাজিস্ট্রেট ব্যবস্থা নিতে পারবেন। তদন্ত চলাকালে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দিতে পারবেন। পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলে ম্যাজিস্ট্রেট আসামিকে অব্যাহতি দিতে পারবেন। পরবর্তী পর্যায়ে নতুন প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকে অভিযুক্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। তদন্তের সময়সীমা ৬০ কার্যদিবস। প্রয়োজনে ম্যাজিস্ট্রেট যুক্তিসংগত সময় বাড়াতে পারবেন। বিলম্ব বা গাফিলতির ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
স্যামারি ট্রায়াল ও সংক্ষিপ্ত বিচার: সংশোধিত বিধানে সংক্ষিপ্ত বিচার আদালতের আর্থিক সীমা ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টাকা করা হয়েছে। একই বৈঠকে চার্জ গঠন থেকে কার্যক্রম সম্পন্ন করা যাবে। যেকোনো স্থানে সংক্ষিপ্ত বিচার আদালত পরিচালনার সুবিধা যুক্ত হয়েছে। পলাতক আসামি আদালতে উপস্থিত না হলেও দ্রুত বিচার করা যাবে।
আপস প্রক্রিয়া সহজীকরণ: ধারা ১৪৩ আপসযোগ্য করা হয়েছে। আদালত আপস কার্যক্রমে সরাসরি সহযোগিতা করতে পারবে। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসও মামলা আপসের জন্য আদালত পাঠাতে পারবে। চুক্তি থাকলে আদালত সাক্ষ্যগ্রহণ ছাড়াই সরাসরি বাস্তবায়ন করতে পারবে। ধারা ৩৯৬–এর মাধ্যমে বেত্রাঘাত শাস্তি বিলোপ করা হয়েছে।
হাজিরা ও সাক্ষী সুরক্ষা: আসামির ব্যক্তিগত হাজিরা শিথিল করা হয়েছে। জামিনপ্রাপ্ত আসামিও আইনজীবীর মাধ্যমে হাজিরা দিতে পারবেন। আদালতের অনুমতিতে আসামি অনুপস্থিত থাকলেও সাক্ষী জেরা করা যাবে। সাক্ষীর খরচ সরকারি আদেশেই নেওয়া যাবে। আদালত সাক্ষী ও ভুক্তভোগীর সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষমতা পাবে।
গুরুতর আঘাতের মামলা: ধারা ৩২৫-কে জামিনঅযোগ্য করা হয়েছে। গুরুতর জখমের ক্ষেত্রে অস্ত্র ব্যবহার ছিল কি না, তা আর জামিনের ক্ষেত্রে বিবেচ্য হবে না। পুলিশের সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, “উদ্দেশ্য ভালো, তবে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। সবচেয়ে বেশি দরকার সদিচ্ছা, তা না থাকলে আইনের লক্ষ্য ব্যাহত হতে পারে।”

