তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স প্রাথমিকভাবে ৫২০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের মুখে পড়েছে। বিষয়টি আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তি আদালতে বিদেশি কোম্পানি আজারবাইজানের সকারের করা মামলার পর এসেছে।
২০১৭ সালে বাপেক্স তিনটি গ্যাস কূপ খননের জন্য সকারের সঙ্গে ৩৯৯ কোটি টাকার চুক্তি করেছিল। পরে চুক্তি ভঙ্গসহ কয়েকটি অভিযোগ এনে সকার আদালতে যায়। ২০২০ সালে সকার সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারে (এসআইএসি) মামলা করে। ২০২৫ সালের ৪ জুলাই আংশিক রায় আসে। বাপেক্স এখন রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বাপেক্স ইতোমধ্যেই রায় পর্যালোচনা করেছে। আইনজ্ঞরা বলছেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রকল্প পরিচালনা না করা এবং আন্তর্জাতিক আদালতে উপযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ না দেওয়ায় বাপেক্স এই ক্ষতির মুখে পড়েছে। বাকি রায় এলে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
প্রকল্পের তিনটি কূপ ছিল খাগড়াছড়ি (দক্ষিণ সেমুতাং-১), নোয়াখালী (বেগমগঞ্জ-৪) এবং জামালপুর (মাদারগঞ্জ-১)। সেমুতাং-১ কূপ ২০১৮ সালের জানুয়ারি খনন করা হয়। কোনো গ্যাস পাওয়া যায়নি। বাপেক্স খননের জন্য ১৪২ কোটি টাকা দিয়েছে। বাকি দুটি কূপ খনন ও প্রস্তুতি নিয়ে সকারের সঙ্গে জটিলতা দেখা দেয়।
বাপেক্স দাবি করে, বেগমগঞ্জ-৪ কূপের প্রস্তুতির জন্য সকার চুক্তির বাইরে ৭৩ কোটি টাকা অগ্রিম চায়। বাপেক্স তা দিতে রাজি হয়নি। একই সময়ে সেমুতাং-১ কূপের বিল পরিশোধে দেরি হয়েছে বলে সকার ২০১৯ সালের জুনে চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয়।
বাপেক্সের কর্মকর্তা জানান, সকার প্রথম কূপ খননে চুক্তির দ্বিগুণ সময় নিয়েছিল। কিছু বিল দেরি হলেও এটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেত। কিন্তু সকার চুক্তি বাতিল করে খনন অসমাপ্ত রেখেই বাংলাদেশ ছাড়ে। এ সময়ে ছয়টি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের পাওনা আদায়ও হয়নি। আজারবাইজান সরকারও বাংলাদেশকে দেনা-পাওনা মিটিয়ে দেয়ার অনুরোধ করে, কিন্তু সকার সমঝোতায় বসেনি।
সকার পারফরম্যান্স গ্যারান্টি, রিগ আটকে রাখা, ডিমোবিলাইজেশন, খরচ এবং সাব-কন্ট্রাক্টরের পাওনা সহ ১১ বিষয়ে ৮৮৩ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করে। ২০২১ সালে বাপেক্স যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আইনি প্রতিষ্ঠান ফলিহগকে নিয়োগ দেয়। লন্ডনে ২০২৩ সালের ২ থেকে ১১ অক্টোবর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
৪ জুলাই এসআইএসি আংশিক রায় দেন। দুইটি দাবি পূর্ণ, পাঁচটি আংশিক এবং চারটি দাবি খারিজ হয়। বাপেক্সকে ৫২০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেয়া হয়। এর মধ্যে বড় অংশ রিগ আটকে রাখার জন্য—১৯৫ কোটি টাকা। রিগের ক্ষতির জন্য ১১৪ কোটি টাকা। এছাড়া প্রকল্পের রাস্তা বিলম্ব, কূপ খনন খরচ, পারফরম্যান্স গ্যারান্টি এবং সাব-কন্ট্রাক্টরের দাবি আংশিক মঞ্জুর হয়েছে।
বাপেক্সের কর্মকর্তা জানান, পর্যাপ্ত তথ্য উপস্থাপন না করার কারণে ক্ষতি হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায়ে আগের সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত থাকলে সব খরচ বাপেক্সকে দিতে হবে। নতুন আইনজীবীর পরামর্শে ফ্রান্সের কোর্ট অব প্যারিসে আপিল করার সম্ভাবনা রয়েছে। এ মামলা চালাতে গত বছরের মার্চ পর্যন্ত ৩৮ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাপেক্সের পক্ষের যুক্তি যথাযথভাবে উপস্থাপন হয়নি। ভালো আইনজীবী নিয়ে শক্তভাবে আপিল করা প্রয়োজন। বাপেক্সের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা জানিয়েছেন, সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের চাপে যুক্তরাষ্ট্রের ফলিহগকে নিয়োগ দিতে হয়। প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক আদালতে যথাযথ ভূমিকা রাখেনি।
এ মামলায় আপিলের জন্য বাপেক্স আইনজীবী শাহ্দীন মালিকের পরামর্শ চাচ্ছে। তিনি জানিয়েছেন, ফরাসি দেওয়ানি কার্যবিধির ১৫২০ ধারার অধীনে আপিলের সুযোগ আছে। তিনি তিনটি বড় ব্যত্যয়ও চিহ্নিত করেছেন—আদালতের নিরপেক্ষতা, সাক্ষী উপস্থাপনার নিয়ম এবং পর্যাপ্ত তথ্য প্রদানের সময়।

