সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো ও দুর্ঘটনা কমাতে ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ ছাড়া দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অন্যদিকে চালক ও পরিবহনশ্রমিকরা জামিন অযোগ্য ধারায় গ্রেপ্তারের বিধান বাতিল না হলে আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে পরিবহন আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল তিন বছরের কারাদণ্ড। তবে ২০১৮ সালে কুর্মিটোলায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় হত্যার মামলা (৩০২ ধারা) করার দাবিতে জনমত গড়ে ওঠে, যেখানে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সাজা দেওয়ার সুযোগ থাকে। পরিবহনশ্রমিকদের আপত্তি ছিল এখানেই। তাঁদের চাপের মুখে তৎকালীন সরকার ২০২৪ সালে আইনের সংশোধনের আশ্বাস দিলেও ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।
সম্প্রতি সরকার আইন সংশোধনে কঠোর অবস্থান জানালে শ্রমিকেরা আন্দোলনের ডাক দেন। তবে গত ১০ আগস্ট সরকারের সঙ্গে বৈঠকের পর তাঁরা আন্দোলন স্থগিত রাখেন।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, আইনের বিভিন্ন ধারা নিয়ে চালক ও মালিকদের আপত্তি থাকলেও জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। এ জন্য জ্যেষ্ঠ সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, “শ্রমিক-মালিক ছাড়াও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সংগঠনগুলোর মতামত নেওয়া হবে। সবার মতামত নিয়েই সংশোধনের খসড়া তৈরি হবে।”
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম মনে করেন, জামিন অযোগ্য ধারায় গ্রেপ্তার চালকের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। তাঁর দাবি, “যথাযথ তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি দিন কিন্তু গ্রেপ্তারকে জামিনযোগ্য করুন।”
২০১১ সালে মানিকগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহত হন। সেই মামলায় চালককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল এখনও বিচারাধীন।
২০১৮ সালের কুর্মিটোলা ট্র্যাজেডি থেকে শুরু হওয়া নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ঢাকাসহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সাত বছর কেটে গেলেও দুর্ঘটনায় মৃত্যুহার কমেনি।
বিআরটিএর হিসাবে ২০২৪ সালে দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৫ হাজার ৩৮০ জনের। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে মৃত্যুর সংখ্যা ৭ হাজার ২৯৪ জন, আর যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানিয়েছে ৮ হাজার ৫৪৩ জন। এত ভিন্ন পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ।
দেশের পরিবহন খাত বহু বছর চালিত হয়েছে ১৯৩৯ সালের বেঙ্গল মোটর ভেহিকেল অ্যাক্ট ও ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশের মাধ্যমে। এসব আইনে শাস্তি ছিল ন্যূনতম। ২০১০ থেকে কয়েক দফা খসড়া তৈরি হলেও শ্রমিক-মালিকদের আপত্তির কারণে কঠোর শাস্তি বাতিল হয়। অবশেষে ২০১৮ সালে পাঁচ বছরের সাজা রেখে আইন পাস হয়।
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, আইন প্রণয়নের সময় পরিবহনশ্রমিকরা নানা বাধা দিয়েছিলেন। লাইসেন্সবিহীন চালনা বন্ধে জোর দাবি এলেও তারা আপত্তি জানিয়েছিলেন। অবশেষে আলোচনার পর আইন কার্যকর হয় ২০১৯ সালে।
আইনজীবী মনজিল মোরসেদ মনে করেন, আইনটির মাধ্যমে প্রত্যাশার ৮০ শতাংশ পূরণ হয়েছে। ঘাটতি থাকলেও কার্যকর প্রয়োগ জরুরি। দুর্ঘটনায় জীবনহানি কমাতে আইন বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাঠপর্যায়ে আইনের অনেক ধারা কার্যকর হয় না। যেমন দুর্ঘটনায় দায়ী চালকের লাইসেন্সে নেতিবাচক নম্বর দিয়ে তা বাতিল করার বিধান আছে, কিন্তু বাস্তবে প্রয়োগ হয় না। ক্ষতিপূরণ তহবিলও সক্রিয় নয়।
তাঁদের মতে, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বাধ্যতামূলক বিমা, কর্মক্ষমতা হারানোর ক্ষতিপূরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা নিশ্চিত করা উচিত।
বুয়েটের এআরআইয়ের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, “রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়া। সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে যা যা প্রয়োজন, তাই করতে হবে। এখানে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।”
নিসচা আন্দোলনের ভাইস চেয়ারম্যান লিটন এরশাদ মনে করেন, আইনের নাম হওয়া উচিত ছিল সড়ক পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা আইন। তাঁর মতে, বর্তমান শিরোনামেই বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।

