জাল রেকর্ডপত্র তৈরি করে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ, সিকদার গ্রুপের মালিক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ৪ জানুয়ারি এ মামলা দায়ের করা হয়।
মামলার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ডেপুটি গভর্নরের সম্পৃক্ততা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুদককে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। এ প্রেক্ষাপটে বিষয়টি স্পষ্ট করতে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয় দুদক।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনে দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন বলেন, ঋণ জালিয়াতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হওয়ার পরও একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি কমিশন সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করেছেন। বিষয়টি জনসমক্ষে পরিষ্কার করা জরুরি বলে দুদক মনে করে।
দুদকের প্রেস নোটে ঋণ বিতরণে একাধিক গুরুতর অনিয়মের কথা তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, সিসিইসিসি-ম্যাক্স-জেভি’র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে চুক্তিপত্রের বিপরীতে ঋণ নেওয়া হয়েছে, সেটি ভুয়া ও জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সেটি যাচাই করেনি।
একই দিনে হিসাব খোলা ও ঋণের আবেদন করা হয়। ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোনো নিয়মনীতি মানা হয়নি। মাত্র চার কার্যদিবসের মধ্যে ঋণ আবেদন থেকে অনুমোদন সম্পন্ন করা হয়। কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই বা ডিউ ডিলিজেন্স অনুসরণ করা হয়নি। নেওয়া হয়নি কোনো জামানতও। এখন পর্যন্ত ব্যাংকে একটি টাকাও ফেরত দেওয়া হয়নি।
ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদের ভূমিকা নিয়ে ব্যাখ্যায় দুদক জানায়, ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ৪৯(১) ধারা অনুযায়ী ন্যাশনাল ব্যাংকের আর্থিক সূচকের অবনতি ও সুশাসনের ঘাটতির কারণে তাকে পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
নিয়ম অনুযায়ী বোর্ড সভার আলোচ্যসূচি তিন কার্যদিবস আগে পর্যবেক্ষককে পাঠানোর কথা। ৪৩৩তম বোর্ড সভায় ছয়জন পরিচালকসহ পর্যবেক্ষক হিসেবে ড. মো. কবির আহাম্মদ উপস্থিত ছিলেন। তাদের সবার সম্মতিতে সব রীতি-নীতি উপেক্ষা করে ঋণ আবেদন জমা দেওয়ার মাত্র ছয় দিনের মধ্যে বোর্ড সভায় ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়।
দুদক বলছে, এ ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালন না করে তিনি ঋণ অনুমোদনে সহায়তা করেছেন। ঋণ, বিনিয়োগ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও জালিয়াতি প্রতিরোধ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত দেওয়া এবং প্রয়োজনে নোট অব ডিসেন্ট দেওয়াই ছিল তার দায়িত্ব।
নিয়ম অনুযায়ী সভা শেষে এক দিনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি তা করেননি। বরং ঋণের পুরো অর্থ উত্তোলন ও আত্মসাতের প্রায় এক মাস পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব অফ-সাইট সুপারভিশনে প্রতিবেদন দেন। আত্মসাতের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে মামলা হয়েছে। এ ঋণ অনুমোদনে তার সংশ্লিষ্টতা তদন্তে আরও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছে দুদক।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ, সিকদার গ্রুপের মালিক মনোয়ারা সিকদার, পারভীন হক সিকদার, রন হক সিকদারসহ ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান পরিচালক এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ মোট ২৬ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এজাহারে বলা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে ভুয়া ওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট দেখিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ৬০০ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন ও উত্তোলন করেন। পরে নগদ, পে-অর্ডার ও ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর করে তা আত্মসাৎ করা হয়।
ঋণের আসল অর্থ পরিশোধ না করায় ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুদ ও অন্যান্য চার্জসহ ব্যাংকের পাওনা দাঁড়ায় ৩০৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকার বেশি। এতে ন্যাশনাল ব্যাংকের মোট আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৯০৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকারও বেশি।
এ ঘটনায় দণ্ডবিধির একাধিক ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করেছে দুদক।

