৫ আগস্ট ২০২৪। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর জাতির সামনে অঙ্গীকার করা হয়েছিল এক ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর, যেখানে থাকবে না কোনো বৈষম্য, থাকবে না কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা।
রাষ্ট্র সংস্কারসহ “আইন ও বিচার বিভাগ” সংস্কারের এক বিশাল প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসা পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্প্রতি ১২ ফেব্রুয়ারি (২০২৬) নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের মেয়াদের সমাপ্তি ঘটিয়েছে।
কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দাঁড়িয়ে যখন আমরা হবিগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনের দিকে তাকাই, তখন সংস্কারের সেই রঙিন স্বপ্ন ধূসর হয়ে যায়। প্রশ্ন ওঠে—সংস্কার কি তবে কেবল নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য- নাকি এটি কেবলই সেই পুরোনো বন্দোবস্ত?
এখন দেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, আর সেই সাথে দীর্ঘ ৪৯১ দিন ধরে কারাবন্দী সুমনের মুক্তির দাবি রাজপথ থেকে আদালত—সর্বত্র জোরালো হয়ে উঠেছে।
৪৯১ দিনের কারাবাস: পূর্বের অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া ‘বিচারিক ক্ষত’
ব্যারিস্টার সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর। আজ ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। ক্যালকুলেটরের হিসেবে এই সময়কাল ৪৯১ দিন—অর্থাৎ ১ বছর ৪ মাস ২ দিন ধরে একজন নাগরিককে কার্যত বিচারহীন অবস্থায় কারাগারে রাখা হয়েছে। ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, তদন্তাধীন মামলায় কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই একজন ব্যক্তিকে এক বছরের বেশি সময় আটকে রাখা ‘বিচারিক হয়রানি’ (Judicial Harassment) ছাড়া আর কিছুই নয়।
ব্যারিস্টার সুমনের বিরুদ্ধে দায়ের করা অধিকাংশ মামলা ‘হুকুমদাতা’ হিসেবে। আইনত দণ্ডবিধির ৩০২ ও ১০৯ ধারায় তাকে অভিযুক্ত করা হলেও ঘটনার সময় তার উপস্থিতির কোনো দালিলিক প্রমাণ রাষ্ট্রপক্ষ দিতে পারেনি। অথচ এই সুদীর্ঘ সময়ে তাকে জামিন না দিয়ে বারংবার রিমান্ড ও কারাগারে পাঠানোর প্রক্রিয়াটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ‘সংস্কার’ দাবির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
সাংবিধানিক অধিকারের নগ্ন লঙ্ঘন: মৌলিক অধিকার কি তবে কাগুজে দলিল?
বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে বর্ণিত ‘মৌলিক অধিকার’ অংশে যে সুরক্ষাগুলো দেওয়া হয়েছে, ব্যারিস্টার সুমনের ক্ষেত্রে তার প্রতিটিই লঙ্ঘিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়:
-
অনুচ্ছেদ ২৭ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা): সংবিধানে বলা হয়েছে, সকল নাগরিক আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। অথচ দেখা যাচ্ছে, একই আন্দোলনের সময় অভিযুক্ত হওয়া অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি জামিন পেলেও ব্যারিস্টার সুমনকে ভিত্তিহীন মামলায় মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়েছে। এটি স্পষ্ট সাংবিধানিক বৈষম্য।
-
অনুচ্ছেদ ৩২ (ব্যক্তিগত স্বাধীনতা): আইনানুগ প্রক্রিয়া ব্যতীত কাউকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। মিথ্যা ও সাজানো মামলার মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদে আটকে রাখা এই অনুচ্ছেদের স্পষ্ট অবমাননা।
-
অনুচ্ছেদ ৩৫ (৩) ও (৫) (দ্রুত বিচার ও মানবিক আচরণ): দ্রুত বিচার লাভের অধিকার সুমনের মৌলিক অধিকার। কিন্তু মামলার স্তূপ সাজিয়ে তাকে এক আদালত থেকে অন্য আদালতে ঘোরানো হচ্ছে। তদুপরি, তাকে পেছনে হাতকড়া পরিয়ে আদালতে হাজির করার দৃশ্যটি অনুচ্ছেদ ৩৫(৫)-এর আলোকে ‘নিষ্ঠুর ও অমানবিক’ আচরণের শামিল।
সংস্কারের নামে প্রহসন: হবিগঞ্জের মাহদী বনাম ব্যারিস্টার সুমন (এক জলজ্যান্ত দ্বিচারিতা)
অন্তর্বর্তী সরকারের বিচার ব্যবস্থার সংস্কার যে কতটা ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ ছিল, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হতে পারে হবিগঞ্জের একটি সাম্প্রতিক ঘটনা:
ঘটনা প্রবাহ: হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসির সঙ্গে চরম অপেশাদার আচরণ ও সরাসরি হুমকি দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা সদস্যসচিব মাহদী হাসান। তিনি প্রকাশ্যে দম্ভোক্তি করেন যে, তারা থানায় আগুন দিয়ে পুলিশকে মেরে ফেলেছেন। এই ভয়ঙ্কর ‘স্বীকারোক্তি’ এবং অরাজকতার উসকানি দেওয়ার পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করলেও মাত্র ১৪ ঘণ্টার ব্যবধানে আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেন!
তুলনা: মাহদী হাসান পুলিশের ওপর আক্রমণ ও থানা পোড়ানোর কথা স্বীকার করেও যদি ১৪ ঘণ্টায় মুক্তি পান, তবে ব্যারিস্টার সুমন—যিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়েছেন এবং নিজে একজন আইনজীবী হিসেবে আইনের শাসনের কথা বলেছেন—তিনি কেন ৪৯১ দিনেও মুক্তি পাচ্ছেন না? এটি কি প্রমাণ করে না যে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের বিচার বিভাগ একটি বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থসিদ্ধির ‘আখড়ায়’ পরিণত হয়েছিল?
সাজানো ও বানোয়াট মামলার ময়নাতদন্ত
বিগত সরকার সুমনকে ‘আ. লীগের দোসর’ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, সুমন নিজ দলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়ে যুবলীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিটে নয়, বরং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রেকর্ড ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। এই জনমানুষের নেতাকে দলীয় লেবাস পরিয়ে জেলে রাখা কেবল মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং একটি জনপ্রিয় কণ্ঠকে স্তব্ধ করার রাষ্ট্রীয় নীল নকশা।
|
|
ব্যারিস্টার সুমনের বিরুদ্ধে দায়ের করা ৮টি মামলা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলোর কোনো আইনি ভিত্তি নেই। তথ্যপ্রমাণের অভাব এবং এজাহারের অসংগতি এই মামলাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবেই চিহ্নিত করে।
খিলগাঁও ও আদাবর থানার হত্যা মামলাগুলোতে তাকে দণ্ডবিধির ৩০২ (হত্যা), ১১৪ (প্ররোচনা) এবং ৩৪ (সাধারণ অভিপ্রায়) ধারায় অভিযুক্ত করা হয়েছে, যদিও ঘটনার সময় তার সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ মেলেনি; বরং তাকে কেবল ‘হুকুমের আসামি’ হিসেবে জড়ানো হয়েছে।
একইভাবে, মিরপুর ও হবিগঞ্জের হত্যাচেষ্টা মামলাগুলোতে ৩০৭ (হত্যাচেষ্টা), ৩২৬ (গুরুতর আঘাত) এবং ১৪৩ (বেআইনি সমাবেশ) ধারা ব্যবহার করা হয়েছে, যা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রতিপক্ষকে দমনের একটি পরিচিত কৌশল হিসেবে প্রতীয়মান হয়।
এছাড়া, অন্যান্য অভিযোগে দণ্ডবিধির ১৪৯ (সাধারণ লক্ষ্য) এবং ৪২৭ (ক্ষয়ক্ষতি) ধারাগুলো যুক্ত করা হয়েছে, যা মূলত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সাধারণ অভিযোগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সংস্কার না কি প্রহসনের আখড়া?
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বলেছিলেন, তারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন। কিন্তু তাদের কার্যকলাপে দেখা গেছে, বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে ভিন্নমত দমন করা হয়েছে। সুমনের মতো একজন সোশ্যাল রিফর্মার, যিনি শত শত ব্রিজ বানিয়েছেন, মানবসেবায় নিয়োজিত থাকতেন, তরুণদের জন্য ফুটবল একাডেমি করেছেন, তাকে কারাগারে আটকে রেখে কার্যত সমাজের উন্নয়নকেই স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
যিনি অপরাধী, তিনি কি দেশ ছেড়ে পালাতেন না? সুমন গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ভিডিও বার্তায় বলেছিলেন তিনি দেশ ছাড়বেন না। তার এই সদিচ্ছাকে মূল্যায়ন না করে তাকে দাগী অপরাধীর মতো হাতকড়া পরানো কি সংস্কারের নমুনা? যদি থানা পোড়ানোর স্বীকারোক্তিকারী মাহদী ১৪ ঘণ্টায় জামিন পায়, তবে সুমনের জন্য বিচারকের হাত কেন কাঁপে?
নির্বাচিত সরকার ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে মুক্তির গণদাবি
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ আজ গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরেছে। মানুষ বিশ্বাস করে, পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে ‘প্রহসনমূলক’ আইনি কাঠামো তৈরি করে গিয়েছিল, জনগণের নির্বাচিত সরকার তা ভেঙে ফেলবে।
ব্যারিস্টার সুমনের ৪৯১ দিনের কারাবাস কেবল একজন ব্যক্তির বন্দীত্ব নয়, এটি একটি বিচারিক অযোগ্যতা ও প্রতিহিংসার প্রতীক। নির্বাচিত নতুন সরকারের কাছে জাতির প্রত্যাশা—ব্যারিস্টার সুমনের মতো জনহিতকর কর্মবীরকে অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে। ন্যায়বিচার কোনো দয়া নয়, এটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। সুমনের মুক্তি এখন কেবল আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের মাপকাঠি।

