ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হচ্ছে আগামী ১২ মার্চ। জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের জোট। ইতোমধ্যেই তারা সরকার গঠন সম্পন্ন করেছে।
জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটে সংবিধান সংশোধনের ‘হ্যাঁ’ প্রাপ্তির পর সব সংসদ সদস্যকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার কথা ছিল। তবে বিএনপি ও তাদের শরিক দলগুলোর কোনো সংসদ সদস্য এই শপথ নেয়নি। তারা শুধুমাত্র সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী জামায়াত-এনসিপিসহ ১১-দলীয় জোটের ৭৭ জন সংসদ সদস্য দুটোই শপথ গ্রহণ করেছেন। ফলে তারা চাইলে সংবিধান সংশোধন পরিষদ গঠন করতে সক্ষম। তবে পরিষদ গঠনের কোরাম ৬০ জন হলেও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কার্যকারিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিএনপি ও তাদের শরিকরা সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক তীব্র হয়ে উঠেছে। দেশের আইন বিশেষজ্ঞরা শপথ গ্রহণের পক্ষে-বিপক্ষে তাদের যুক্তি ও অভিমত প্রকাশ করছেন। তবে সাংবিধানিক জটিলতার পাশাপাশি সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারি দল বিএনপির অনড় অবস্থানের কারণে বিষয়টির সমাধান সহজ নয় বলে মনে করছেন অনেকেই।
দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতকের আইন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, “জুলাই গণভোটের রায় যদি কার্যকর হয়, তাহলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো বাস্তব প্রয়োজন থাকছে না। যারা পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন, তারা জুলাই আদেশ অনুযায়ী নিজেরাই সংবিধান সংশোধন করতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে সংসদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে চাইলে তা সফল হবে না, কারণ জনগণ এখন স্থিতিশীলতা চায়। কোনো আইনই সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়। সংবিধান সকল আইনের ঊর্ধ্বে।”
অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির বলেন, “জুলাই সনদ ও গণভোট বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি রয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো আদালত তা বাতিল করেনি, ততক্ষণ আইন অনুসরণ বাধ্যতামূলক। যারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি, তারা সরাসরি আইন লঙ্ঘন করেছেন। সংবিধান আসমানি কিতাব নয়। জনগণ চাইলে সংবিধান পরিবর্তনযোগ্য, এবং গণভোটের মাধ্যমে সেই রায় জনগণ দিয়েছে।”
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জানান, “গণভোটের অধ্যাদেশ রাষ্ট্রপতির নামে জারি করা হয়েছে। তবে এ ধরনের অধ্যাদেশ বৈধ কি না, তা নিয়ে আইনি প্রশ্ন রয়েছে। যদি অধ্যাদেশ ও অধীন গণভোটকে বৈধ করতে হয়, তা হলে সংসদে উত্থাপন করে পাস করানো প্রয়োজন। বিএনপি এখন সংসদে এটি তুলবে কি না, তা সময় দেখাবে। এছাড়া সংবিধানে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। সংবিধানে যা নেই—যেমন সংসদ যে বিষয়ে আইন করতে পারে না বা যা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক—সেসব বিষয়ে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন না। যেহেতু সংবিধানে গণভোটের বিধান নেই, তাই এ বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি করার এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির নেই। ফলে এই বিষয়গুলো আইনি প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।”
অন্যদিকে সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, “সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় প্রথম ধাপ ছিল সংবিধান সংস্কার আদেশ জারি, দ্বিতীয় ধাপ গণভোট এবং তৃতীয় ধাপ সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন। প্রথম দুটি ধাপ সম্পন্ন হলেও, বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ায় তৃতীয় ধাপে বাধা তৈরি হয়েছে। ফলে বিএনপি দুইভাবে জনগণের রায়কে উপেক্ষা করেছে। যেহেতু সংবিধান সংস্কার আদেশ গণভোটে জনগণের সম্মতি পেয়েছে, তাই সব সংবিধান সংশোধন বিষয়ও জনগণের অনুমোদিত। এছাড়া বিএনপি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়ে সংস্কার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এখন তারা সেই অবস্থান থেকে সরে এসে জনরায়কে উপেক্ষা করেছে।”
এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর তার ফেসবুক লাইভে বলেন, “জামায়াতসহ যেসব সংসদ সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়েছেন, তারা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ ভঙ্গ করেছেন। কারণ সংসদ সদস্য হিসেবে তাদের শপথে সংবিধান রক্ষা ও সাংবিধানিক বিধান বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এরপরই তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ করেছেন, যার কোনো অস্তিত্ব সংবিধানে নেই। এ ক্ষেত্রে তারা সংবিধান লঙ্ঘনের দণ্ডনীয় কাজ করেছেন।”
সাংবিধানিক কারণে বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণে বিরত থাকায় জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জুলাই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব ছিল, যার মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সংক্রান্ত এবং বাকি ৩৬টি সরকারি আদেশ, অধ্যাদেশ বা আইনবিধি সম্পর্কিত। সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার কিছু প্রস্তাব ইতোমধ্যেই বাস্তবায়ন করেছে। তবে সংবিধান-সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো কোনো অধ্যাদেশ বা আদেশের মাধ্যমে কার্যকর করা সম্ভব নয়।
সংবিধান-সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাব নিয়ে চারটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ভোটে ‘হ্যাঁ’ প্রাপ্তির ফলে প্রস্তাবগুলোতে জনগণের অনুমোদন নিশ্চিত হয়। এরপর জাতীয় সংসদে যেসব বিষয় পাস হবে, সেগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়টি যুক্ত হলে বিএনপি সেই শপথ গ্রহণে রাজি হতে পারে। তবে তখন জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি সদস্যরা নতুন শপথ গ্রহণ করবেন কি না, তা প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাচ্ছে। নতুন সরকারের অধীনে জুলাই সনদের কতটুকু বাস্তবায়ন দৃশ্যমান হবে, তা দেখতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে জাতীয় সংসদের অধিবেশনের সিদ্ধান্ত পর্যন্ত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হচ্ছে আগামী ১২ মার্চ। এই অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ ও দায়িত্ব পালন নিয়ে আলোচনা বা বিতর্ক দেখা দিতে পারে। বর্তমানে এই পদগুলো শূন্য। সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের নিয়োগ ও দায়িত্ব সম্পর্কিত বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, সংসদের প্রথম অধিবেশনে নতুন স্পিকার নিয়োগ দেওয়া হবে। তবে নতুন স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত পূর্বের পদাধিকারীই দায়িত্ব পালন করবেন।
যদি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয়ই না থাকেন, তাহলে সংবিধানের ৭৪(৩) অনুচ্ছেদের বিধি অনুযায়ী সংসদের কার্যপ্রণালি-বিধি অনুসারে কোনো সংসদ সদস্যই স্পিকারের দায়িত্ব পালন করবেন। অনুচ্ছেদটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে:
‘স্পিকারের পদ শূন্য হইলে বা তিনি [রাষ্ট্রপতিরূপে কার্য করিলে] কিংবা অন্য কোনো কারণে তিনি স্বীয় দায়িত্ব পালনে অসমর্থ বলিয়া সংসদ নির্ধারণ করিলে স্পিকারের সকল দায়িত্ব ডেপুটি স্পিকার পালন করিবেন, কিংবা ডেপুটি স্পিকারের পদও শূন্য হইলে সংসদের কার্যপ্রণালি-বিধি-অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য তাহা পালন করিবেন; এবং সংসদের কোনো বৈঠকে স্পিকারের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার কিংবা ডেপুটি স্পিকারও অনুপস্থিত থাকিলে সংসদের কার্যপ্রণালি-বিধি-অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য স্পিকারের দায়িত্ব পালন করিবেন।’

