সদ্য বিদায়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার মাত্র ৫৫৫ দিনে দায়িত্ব শেষ করেছে। এই সময়ে সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটি মিলিয়ে মোট ২৩৫ দিন বিশ্রাম ছিল। অর্থাৎ কার্যকরীভাবে তারা দায়িত্ব পালন করেছে ৩২০ কর্মদিবস। সীমিত সময়ের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছে। গড়ে প্রতি আড়াই দিনে একটি করে অধ্যাদেশ। এটি অতীতের অনির্বাচিত সরকারগুলোর তুলনায় অনন্য, কারণ পূর্বের অনির্বাচিত সরকার সাধারণত এত দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত না।
সংবিধান অনুযায়ী, কোনো অধ্যাদেশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে পাস না হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। এর মানে সংসদকে প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচটি অধ্যাদেশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব অধ্যাদেশের অধিকাংশই সম্ভবত বাতিল হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটির বৈধতা নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ-২০২৬’, গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫-এর ধারা ২২, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতাগ্রহণ ও দায়িত্ব পালনের বৈধতা সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সংবিধানগত ভিত্তি না থাকা এমন দায়মুক্তি ও বিতর্কিত অধ্যাদেশগুলো সংসদে পাশ হলেও আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেন। প্রথম কর্মদিবস হিসেবে ১১ আগস্ট রবিবার থেকে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন শুরু হয়। ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৪৩ দিনে সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটি মিলিয়ে ৫৭ দিন বাদ দিয়ে ৮৬ কর্মদিবসে ১৭টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। পরবর্তীতে, ২০২৫ সালের ৩৬৫ দিনে ১০৪ দিন সাপ্তাহিক ছুটি ও ৫৭ দিন সরকারি ছুটি বাদ দিয়ে ২০৪ কর্মদিবসে ৮০টি অধ্যাদেশ জারি হয়। চলতি বছর ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৪৭ দিনে ১৭ দিন ছুটি বাদ দিয়ে ৩০ কর্মদিবসে ৩৬টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। শেষ সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার দিনে গড়ে একটিরও বেশি অধ্যাদেশ জারি করেছে, যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
এর আগে ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ১২২টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। পরে নবম জাতীয় সংসদে এই অধ্যাদেশগুলো একসঙ্গে উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ৫৪টি অধ্যাদেশই আইন হিসেবে গৃহীত হয়, বাকি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।
সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জানিয়েছেন, ‘দায়মুক্তির অধ্যাদেশগুলো সংবিধানবিরোধী। সংসদে পাশ হওয়ার সম্ভাবনা কম। পাশ হলেও আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। অতীতেও অনেক অধ্যাদেশ বাতিল হয়েছে। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের বিতর্কিত অধ্যাদেশগুলো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারবে না।’

