বহুল আলোচিত হলিউড জুটি Johnny Depp ও Amber Heard–এর মানহানি মামলা নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টারি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম Netflix-এ ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রশ্ন জাগে, কিভাবে একটি চলমান বা সাম্প্রতিক মামলার ট্রায়াল, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং আইনজীবীদের যুক্তি এত নিখুঁতভাবে এবং সিনেম্যাটিক ভঙ্গিতে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা সম্ভব? এর উত্তর জানতে হলে প্রথমে মামলার প্রেক্ষাপট জানা জরুরি।
মামলার পটভূমি:
২০১৫ সালে বিয়ের মাত্র পনের মাসের মাথায় জনি ডেপ ও অ্যাম্বার হার্ডের বিচ্ছেদ ঘটে। ২০১৬ সালে বিচ্ছেদের প্রায় দুই বছর পর অ্যাম্বার হার্ড একটি মার্কিন পত্রিকায় মতামতধর্মী লেখা প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি নিজেকে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হিসেবে উপস্থাপন করেন। লেখায় সরাসরি ডেপের নাম না থাকলেও, প্রেক্ষাপট ও পরিচিতি জনমনে এই অভিযোগকে ডেপের দিকে ইঙ্গিত করে।
জনি ডেপ লেখাটিকে নিজের সুনামের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর মনে করে অ্যাম্বার হার্ডের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে জুরি বোর্ড বৃহদাংশে হার্ডের পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে ডেপের পক্ষে রায় ঘোষণা করে। মামলাটি চলাকালীন সময়েই বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, এবং আদালতের প্রতিটি মুহূর্ত গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রায় সরাসরি জনসমক্ষে চলে আসে।
আদালতের সম্প্রচার: বিভিন্ন দেশের বাস্তবতা
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া স্টেট কোর্টে ট্রায়ালের ছবি বা ভিডিও ধারণ করা বিচারকের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল। তবে কিশোর অপরাধ, যৌন সহিংসতা বা গোপন গোয়েন্দা কার্যক্রম সংক্রান্ত মামলায় সাধারণত এমন সম্প্রচার সীমিত থাকে।
এদিকে যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট ও কোর্ট অব আপিল বহু ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিডিও ধারণ ও সরাসরি সম্প্রচারের অনুমতি দেয়। কানাডার সুপ্রিম কোর্ট ভিডিও সংরক্ষণও নিশ্চিত করে। অস্ট্রেলিয়ার হাইকোর্ট নিয়মিতভাবে ট্রায়াল লাইভ সম্প্রচার করে। ব্রাজিল, ফ্রান্স ও জার্মানির সুপ্রিম কোর্টগুলোও একই ব্যবস্থা অনুসরণ করে। ভারতের সাংবিধানিক বেঞ্চও গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি সরাসরি সম্প্রচারের সুবিধা দেয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতা ও আস্থা:
বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ও অনাস্থার শেষ নেই। দুর্নীতি, দীর্ঘসূত্রতা, বিচারপ্রার্থী মানুষের আদালতভীতি এবং ‘উকিলভীতি’—সব মিলিয়ে আদালতের বারান্দা অনেকের কাছে ন্যায়বিচারের আশ্রয় নয়, বরং ভীতিকর অভিজ্ঞতা। বিচার যে মৌলিক অধিকার, এই ধারণা সত্ত্বেও আদালতে যাওয়া অনেকের কাছে কঠিন।
এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে আদালতের প্রসিডিং সম্প্রচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এটি বিচার প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ রাখে এবং বিচারক ও আইনজীবীদের পেশাগত মান উন্নত করে।
প্রযুক্তি, পেপারলেস ব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ:
বর্তমান যুগে আদালতের কার্যধারা রেকর্ড করা বড় সমস্যা নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল দেখিয়েছে, ইচ্ছা থাকলে প্রযুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। পেপারলেস কোর্ট ব্যবস্থা শুধু কার্বন নিঃসরণ কমায় না, বরং দৈনন্দিন কাজেও সাহায্য করে।
প্রতিটি বাক্য কলম দিয়ে লিখতে লিখতে, গরমকালে মানুষের ভিড়ে বিচারকরা অসহায় হয়ে পড়েন। থানার ডিউটি অফিসারের রসিক মন্তব্য—“চাকরি জীবনে যত কলম-খাতা ব্যবহার করলাম, এসব চাঁদে বসে লিখলে চাঁদ কালো হয়ে যেত”—বাস্তবতা তুলে ধরে।
কোয়ান্টামের যুগে দাঁড়িয়ে আমাদের বিচার ব্যবস্থার এই সেকেলে নিয়মগুলো আজকাল বেমানান। সময় এসেছে স্বচ্ছতা, প্রযুক্তি ও জনআস্থা একসাথে বিচার ব্যবস্থায় ফেরাতে।
লেখক : মোঃ রওশন জাদীদ: অ্যাডভোকেট, সুপ্রীম কোর্ট অব বাংলাদেশ।

