কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে আইনি সেবা দেওয়ার জন্য ‘Find My Advocate’ নামে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু হয়েছে।

বাংলাদেশে আইনি পরামর্শ পাওয়ার প্রক্রিয়াকে সহজ ও দ্রুত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ডিজিটাল আইনি প্ল্যাটফর্ম ‘www.findmyadvocatebd.com’ যাত্রা শুরু করেছে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঘরে বসেই দেশের যেকোনো প্রান্তে থাকা অভিজ্ঞ আইনজীবীদের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করা যাবে। ফলে সাধারণ মানুষ দ্রুত ও সহজভাবে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।ডিজিটাল এই প্ল্যাটফর্মটি মূলত বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের মধ্যে একটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ তাঁদের আইনি সমস্যার ধরন অনুযায়ী দ্রুত সঠিক আইনজীবী খুঁজে পেতে পারবেন এবং প্রাথমিক আইনি পরামর্শও নিতে পারবেন।
এআই প্রযুক্তির ব্যবহার:
প্ল্যাটফর্মটির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর এআই-চালিত সার্চিং ও চ্যাটিং সিস্টেম। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবহারকারী তাঁর আইনি সমস্যার ধরন উল্লেখ করলে সিস্টেমটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ আইনজীবীদের তথ্য প্রদর্শন করবে। ফলে আইনজীবী খোঁজার দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া অনেকটাই সহজ হয়ে আসবে।
এ ছাড়া প্ল্যাটফর্মটিতে একটি এআই লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট যুক্ত করা হয়েছে, যা ব্যবহারকারীদের জন্য ২৪ ঘণ্টা প্রাথমিক আইনি তথ্য ও পরামর্শ দিতে সক্ষম। এর ফলে অনেক সাধারণ আইনি প্রশ্নের উত্তর ঘরে বসেই দ্রুত পাওয়া সম্ভব হবে।
সারা দেশের আইনজীবীদের তথ্যভান্ডার:
প্ল্যাটফর্মটির তথ্যভান্ডারে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলার নিবন্ধিত আইনজীবীদের তথ্য সংযুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা দেওয়ানি, ফৌজদারি, কর ও ভ্যাট, সাইবার অপরাধ, দলিল লেখক, বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রারসহ বিভিন্ন ধরনের আইনি সেবার জন্য উপযুক্ত আইনজীবীর সন্ধান সহজেই পেতে পারবেন।
এছাড়া প্রতিটি আইনজীবীর অভিজ্ঞতা, কর্মস্থল, দক্ষতার ক্ষেত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্যও প্ল্যাটফর্মে যুক্ত রয়েছে। ফলে ব্যবহারকারীরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী আইনজীবী নির্বাচন করার সুযোগ পাবেন।
উদ্যোক্তার বক্তব্য:
এই প্ল্যাটফর্মের উদ্যোক্তা মো. হায়দার তানভীরুজ্জামান, যিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী। তিনি জানান, বাংলাদেশের অনেক মানুষ প্রয়োজনের সময় দ্রুত আইনি পরামর্শ পান না। অনেক ক্ষেত্রে আইনজীবীর চেম্বারে একাধিকবার যেতে হয় এবং নির্ধারিত সময় পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়।
তিনি বলেন, “আমাদের দেশে আইনি সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়া অনেক সময় জটিল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে থাকে। এই দীর্ঘ ও হয়রানিমূলক প্রক্রিয়া থেকে মানুষকে মুক্তি দিতেই আমরা এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করেছি।”
মো. হায়দার তানভীরুজ্জামান জানান, এটি একটি স্টার্টআপধর্মী উদ্যোগ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সাইফুর রহমান মাহিন তৃণমূল পর্যায়ের কার্যক্রম তদারকির পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম সমন্বয় করেও কাজ করছেন, যাতে সেবাগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।
এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটিতে প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) হিসেবে কাজ করছেন কাজী মো. খালেদ বিন আসাদ অভি, এডমিন সাইদুল আরেফিন, আইন উপদেষ্টা হিসাবে আছেন এডভোকেট অলিউর রহমান,এডভোকেট রায়হান কবির,এডভোকেট মোহাম্মদ সোহাগ, ব্যারিস্টার তাসমিয়া আন্জুম যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে আইনকে সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করছেন।
দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহার: প্ল্যাটফর্মটিতে ব্যবহৃত হয়েছে বাংলাদেশের কিশোর প্রযুক্তিবিদ ইহান চৌধুরীর তৈরি Sytex AI প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা দ্রুত আইনি তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় আইনজীবীর সন্ধান পেতে পারবেন।
অনলাইনেই আইনি পরামর্শ: ডিজিটাল এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা মোবাইল ফোন থেকেই আইনজীবীর সঙ্গে অডিও,ভিডিও কলের মাধ্যমে কথা বলতে পারবেন। এছাড়া প্রয়োজনে আইনজীবীর চেম্বারে সাক্ষাৎ কিংবা বাসায় সাক্ষাতের সময়ও নির্ধারণ করা যাবে।
আইনজীবীদের জন্য নতুন সুযোগ: এই প্ল্যাটফর্মটি শুধু সাধারণ মানুষের জন্যই নয়, আইনজীবীদের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। নতুন ও অভিজ্ঞ আইনজীবীরা এখানে নিজেদের প্রোফাইল তৈরি করে অনলাইনে তাঁদের আইনি সেবা পরিচালনা করতে পারবেন। পাশাপাশি তাঁরা নিজেদের সময়সূচি ও অ্যাপয়েন্টমেন্টও সহজে ব্যবস্থাপনা করতে পারবেন।
ডিজিটাল আইনি সেবার নতুন যুগ:
প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশেও বিভিন্ন খাতে ডিজিটাল সেবার বিস্তার ঘটছে। এর ধারাবাহিকতায় এআই প্রযুক্তিনির্ভর এই নতুন আইনি প্ল্যাটফর্ম চালুর মাধ্যমে দেশে আইনি সেবা খাতে একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ ভবিষ্যতে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য আইনি সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
- লেখক: মো. হায়দার তানভীরুজ্জামান: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

