চীন-কানাডীয় লেখক Dan Wang একবার বলেছিলেন, “চীন গড়ে উঠেছে ইঞ্জিনিয়ারদের দ্বারা, আমেরিকা আইনজীবীদের দ্বারা এবং ভারত তথা আমরা গড়ে উঠেছি রাজনীতিবিদদের দ্বারা।” যদিও এটি কেবল একটি মন্তব্য, তবুও এতে দেশের রাষ্ট্রগঠনে নেতৃত্বের ধরন ও প্রভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে।
আজকের আমেরিকা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র। সেমিকন্ডাক্টর, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ আধুনিক প্রযুক্তি থেকে শুরু করে সামরিক শক্তির ক্ষেত্রেও দেশটি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে। অথচ একসময় এটি ব্রিটিশদের একটি উপনিবেশ ছিল। ১৬০৭ সালে ব্রিটিশরা সেখানে প্রথম উপনিবেশ স্থাপন করে, যা ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ আধিপত্যের সূচনার চেয়ে প্রায় পাঁচ দশক আগে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা অর্জন এবং পরবর্তী দ্রুত অগ্রগতিতে আইনজীবীদের অবদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৭৬৫ সালে ব্রিটিশরা ১৩টি উপনিবেশে স্ট্যাম্প অ্যাক্ট চাপলে James Otis, John Adams এবং Patrick Henry-এর মতো আইনজীবীরা সংগঠিতভাবে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। তাদের যুক্তিনির্ভর প্রতিবাদ ও সাংবিধানিক বিতর্ক উপনিবেশবাসীর মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করে। পরবর্তীতে Thomas Jefferson ও Alexander Hamilton-এর মতো প্রখ্যাত আইনজীবীরা আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রামে নিরূপণীয় ভূমিকা পালন করেন। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি মূলত আইনজীবী ছিলেন।
১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে যে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তার ভিত্তিতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, নাগরিক অধিকার এবং সাংবিধানিক শাসনের মতো নীতি স্থাপন হয়। একে সঙ্গে আইনি দর্শন, প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা এবং সরকারের জবাবদিহিতার মতো মৌলিক ধারণাগুলোও রাষ্ট্রকাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ায় আইনজীবীরা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর গঠনকে শক্তিশালী করে।
স্বাধীনতার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পাঁচজন রাষ্ট্রপতির মধ্যে চারজনই ছিলেন আইনজীবী। তারা নতুন রাষ্ট্রের জন্য একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি John Marshall বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা (Judicial Review) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংবিধানকে শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। এই প্রক্রিয়ায় সংবিধান ও আইনের শাসন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় কাঠামো গঠনে আইনজীবীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতীয় উপমহাদেশেও আইনজীবীরা রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। চিত্তরঞ্জন দাস ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অগ্রদূত ছিলেন। একইভাবে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং শেখ মুজিবুর রহমান-এর মতো আইনপেশার সঙ্গে যুক্ত নেতারা এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন ও সংবিধান প্রণয়নে আমীর-উল ইসলাম ও ড. কামাল হোসেন-এর মতো আইনজীবীদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তবে বর্তমান সময়ে আইনজীবী সমাজ থেকে যে ধরনের গঠনমূলক ভূমিকা প্রত্যাশিত ছিল, তা অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত বলে মনে হচ্ছে। অনেক সময় পেশাগত ঐক্যের পরিবর্তে রাজনৈতিক বিভাজনই বেশি দৃশ্যমান হয়। অথচ আইনের মূল দর্শন হলো সকল নাগরিকের জন্য সমতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। এই কারণে আইনজীবীদের উচিত ব্যক্তিগত বা দলীয় অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া।
একটি রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে আইনের শাসন অপরিহার্য। আর সেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আইনজীবী সমাজের ভূমিকা অমূল্য। তাই রাষ্ট্র ও সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে আইনজীবীদের দায়িত্বশীল, ন্যায়নিষ্ঠ এবং পেশাগতভাবে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করা সময়ের দাবি।
লেখক: মোঃ রওশন জাদীদ: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

