আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) চলমান বিচার প্রক্রিয়াকে ঘিরে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের এক প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ঘুস দাবির অভিযোগ সামনে আসার পর বিচার অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিচারপ্রার্থী, শহীদ পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীদের মধ্যে এ ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্র জানায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলমান রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এ সময় একটি মামলার এক আসামিকে জামিন পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে এক কোটি টাকা ঘুস দাবি করার অভিযোগ ওঠে প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে। অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসার পর বিচার সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে সাইমুম রেজা তালুকদার ট্রাইব্যুনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পেলেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি আইনজীবী হিসেবে কোনো আদালতে তালিকাভুক্ত নন। অথচ মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো স্পর্শকাতর মামলার দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যেও আলোচনা চলছে।
আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মামলা পরিচালনার জন্য দেশের কোনো আদালতেই তালিকাভুক্ত হতে পারেননি সাইমুম রেজা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি ইতোমধ্যে বিচার প্রক্রিয়া থেকে ছিটকে পড়েছেন। এমন একজন ব্যক্তির নিয়োগ পাওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্বলতার দিকও তুলে ধরে বলে মনে করছেন অনেকে।
এদিকে গণঅভ্যুত্থনের শহীদ পরিবারের সদস্যরা বলছেন, কেবল পদ থেকে অব্যাহতি দিলেই যথেষ্ট হবে না। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে সাইমুম রেজাকে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, বিচার প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে কঠোর পদক্ষেপ জরুরি।
আইসিটির এক কর্মকর্তা জানান, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন চট্টগ্রাম-৬ আসনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী। অভিযোগ রয়েছে, তাকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তার পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা ঘুস দাবি করেছিলেন প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা।
একটি জাতীয় দৈনিকে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। এর পর থেকেই প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে আরও নানা তথ্য সামনে আসতে শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সাইমুম রেজার নিয়োগ সংক্রান্ত প্রক্রিয়া
সাইমুম রেজার বিষয়ে তার ঘনিষ্ঠ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে জানা গেছে, তিনি পরিস্থিতির অনুকূলে সহজেই মানিয়ে নেওয়ার স্বভাবের। ছাত্রাবস্থায় তিনি বামপন্থা ঘরানার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের পর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরামের আইনবিষয়ক সম্পাদকের পদে অবস্থান নেন।
শিক্ষাজীবনে সাইমুম রেজা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) আইন বিভাগে অধ্যয়ন করেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি চবি ডিবেটিং ক্লাবসহ বিভিন্ন বামপন্থী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে সক্রিয় ছিলেন। পরবর্তীতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। ঢাকার নাগরিক সমাজে পরিচিত মুখ হিসেবে তিনি শিক্ষক নেটওয়ার্কের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন প্রোগ্রামে সরব উপস্থিতি দেখিয়েছেন।
রাজনৈতিক হাওয়া বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে সাইমুম রেজা জাতীয়তাবাদী ধারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি জুলাই বিপ্লবের পর গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরের পদে নিয়োগ পান। এছাড়া ‘জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম’-এর আইনবিষয়ক সম্পাদকের পদেও রয়েছেন তিনি।
আইসিটি সূত্রে জানা গেছে, সাইমুম রেজা ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পান। সে সময় তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। যদিও তিনি ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ও সিকিউরিটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, তবে ট্রাইব্যুনালে নিয়োগ পাওয়ার আগে কোনো উল্লেখযোগ্য মামলা পরিচালনার অভিজ্ঞতা তার ছিল না।
সাইমুম রেজার নিয়োগ নিয়ে জানতে চাইলে সদ্যবিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর ও সিনিয়র আইনজীবী তাজুল ইসলাম বলেন, “সরকার নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাকে নিয়োগ দিয়েছে। আমাদের টিমে যুক্ত হওয়ার পর তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় দায়িত্বে ছিলেন। কিছু গাফিলতি ও উড়ো কথা শোনার পর তাকে সেই মামলা থেকে সরিয়ে দিয়েছি। তবে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ বা অডিও রেকর্ড আমার কাছে আসেনি। তাই তাকে ট্রাইব্যুনাল থেকে সরানোর কোনো সুযোগ ছিল না। গণমাধ্যমে যা সংবাদ প্রচার হচ্ছে, তা সত্য নয়।”
অন্তর্বর্তী সরকারের দুজন উপদেষ্টা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছেন। তারা জানান, বিষয়টি এখন তদন্ত ও অনুসন্ধানের পর্যায়ে রয়েছে। তদন্তে প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী সাইমুম রেজার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে সরকার।
সাইমুমকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের মামলায় তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। মামলার আসামি ছিলেন চট্টগ্রাম-৬ আসনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী।
সূত্রে জানা গেছে, সাইমুম রেজা আসামির জামিন পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের কাছ থেকে এক কোটি টাকা ঘুস দাবি করেন। হোয়াটসঅ্যাপের কলরেকর্ডে এই কথোপকথন ধরা পড়েছে। এক রেকর্ডে তিনি পরিবারের এক সদস্যকে বলেন, “শেষ পর্যন্ত আমি যদি ফজলে করিম চৌধুরীকে বের করতে পারি, তাহলে একটি বেশ ভালো অ্যামাউন্টের বিষয় থাকবে। আমি ওয়ান ক্রোর (এক কোটি টাকা) বলেছিলাম।” এছাড়া তিনি এক কোটি টাকার অগ্রিম ১০ লাখ টাকা নগদ হিসেবে দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামকে সরিয়ে অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলামকে নতুন চিফ প্রসিকিউটরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর সাইমুম রেজা আবার ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, তিনি মামলাটিতে ফিরে আসবেন। এই কথোপকথনের রেকর্ডিং পরিবারের পক্ষ থেকে নতুন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানকে প্রদান করা হয়। রেকর্ড অনুযায়ী, সাইমুম রেজা বলেন, “মন্ত্রী আমাকে গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়েছেন।”
ঘটনাটি প্রকাশিত হওয়ার পর ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরের নিয়োগ ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে দেশের বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। শহীদ পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীরা ঘটনায় তদন্ত চালিয়ে দোষী প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সাইমুম রেজা তালুকদারের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এক সময় তিনি বামপন্থা ঘরানার বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তবে হঠাৎ জাতীয়তাবাদী ধারার সঙ্গে যুক্ত হওয়াকে ঘিরে “আমার দেশ”-এর পক্ষ থেকে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “এটা আমার চিন্তাগত পরিবর্তনের ফল। মানুষ তো সব সময় একরকম থাকে না। আগে বাম সংগঠনে যুক্ত ছিলাম, এখন মনেপ্রাণে আমি জাতীয়তাবাদী।” অপরাধের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “এই অভিযোগ সত্য নয়। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।

