আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাম্প্রতিক সময়েই শুরু হয়েছে নতুন অধ্যায়। ক্ষমতার পালাবদলের এই পর্বে নিয়োগ পেয়েছেন নতুন চিফ প্রসিকিউটর। কিন্তু দায়িত্ব হস্তান্তরের ধুলো না বসতেই সামনে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ, যা ট্রাইব্যুনালকে আবারও বিতর্কের কেন্দ্রে এনে দিয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগকে ভিত্তি করে দেশে যে বিচারিক পুনর্গঠনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেই প্রত্যাশার মাঝেই এবার দেখা দিয়েছে নতুন প্রশ্ন। ট্রাইব্যুনালের ওপর অর্পিত ছিল জুলাই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরেই এখন আলোচনায় এসেছে ‘কোটি টাকার ঘুষ’ সংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগ।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে এক প্রভাবশালী আসামিকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে বিপুল অঙ্কের অর্থের দরকষাকষির বিষয়টি। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট একটি ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার পর বিষয়টি দ্রুত আলোচনায় উঠে আসে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে বিস্ময় ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
এই বিতর্ক শুধু একজন প্রসিকিউটরের ব্যক্তিগত নৈতিকতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেনি। বরং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতাকেও কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। যে প্রতিষ্ঠানের কাছে মানুষ ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করে, সেই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে এমন অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এ অবস্থায় অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, অর্থের প্রভাব কি তবে বিচার প্রক্রিয়াকেই প্রভাবিত করবে? জুলাইয়ের শহীদদের আত্মদানের স্মৃতি সামনে রেখে গড়ে ওঠা বিচারিক প্রক্রিয়া কি বিতর্কে ঢেকে যাবে? বিষয়টি এখন তদন্ত ও ব্যাখ্যার অপেক্ষায়।
ঘটনার নেপথ্যে
প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালনের পর গত ৯ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার পদত্যাগ করেন। তিনি জানান, আবার শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে পদত্যাগের দিনই গণমাধ্যমে ফাঁস হয় তার দুটি ফোনালাপ, যা দ্রুতই নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।
ফাঁস হওয়া অডিওতে চট্টগ্রাম-৬ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর জামিনের বিনিময়ে এক কোটি টাকা দাবি করার বিষয়টি আলোচনায় আসে। ওই কথোপকথনে ফোনের অপর প্রান্তে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা ফজলে করিমের আইনজীবী ও তার প্রাক্তন স্ত্রী রিজওয়ানা ইউসূফ। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ঘটনাটি ঘিরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
অভিযোগে বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রাম কলেজের এক শিক্ষার্থী হত্যাকাণ্ডের মামলায় আসামি সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরীকে জামিন পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে এই অর্থ দাবি করা হয়েছিল। সম্প্রতি প্রকাশ পাওয়া দুটি ফোনালাপে অর্থ লেনদেন এবং তা কিস্তিতে পরিশোধের সম্ভাব্য ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা করতে শোনা যায় বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন সাইমুম রেজা তালুকদার। তার বক্তব্য, অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই এবং বিষয়টি তিনি আইনগতভাবেই মোকাবিলা করবেন।
প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে সাইমুম রেজা তালুকদার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ল’-এ জ্যেষ্ঠ প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর পাশাপাশি গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত বিএনপির তথ্য ও প্রযুক্তি দপ্তরের অধীন ‘জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম’-এর আইনবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বেও তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ট্রাইব্যুনাল ও মামলার প্রেক্ষাপট
ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে কলেজছাত্র ওয়াসিম আকরাম হত্যা মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীকে ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার দেখায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। আদালত আগামী ১৬ মার্চ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
এর আগে ১২ জানুয়ারি মামলার শুনানির সময় ফজলে করিম চৌধুরীর আইনজীবী ও তার প্রাক্তন স্ত্রী রিজওয়ানা ইউসূফ আদালতের সামনে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেন। তিনি তার মক্কেলের শারীরিক অবস্থার কথা উল্লেখ করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে অপপ্রচার ও হেনস্তার অভিযোগও জানান।
শুনানির সময় তিনি তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে ঘিরে সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগের কথাও আদালতের নজরে আনেন। বিষয়টি শুনে ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম-পরিচয়সহ লিখিত আবেদন আকারে জমা দিতে নির্দেশ দেন। মামলাটি এখনো তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়ার পর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে।
প্রসিকিউটর বদলি ও কোটি টাকার প্রস্তাব
প্রসিকিউশন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম কলেজছাত্র ওয়াসিম আকরাম হত্যা মামলার দায়িত্ব সময়ের ব্যবধানে একাধিক প্রসিকিউটরের হাতে গেছে। শুরুতে মামলাটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন সাইমুম রেজা তালুকদার ও আবদুল্লাহ আল নোমান। পরে তাদের পরিবর্তে দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রসিকিউটর মঈনুল করিমকে।
দায়িত্ব পাওয়ার পর মঈনুল করিম তদন্তের অংশ হিসেবে চট্টগ্রামে গিয়ে সাক্ষ্য সংগ্রহসহ বিভিন্ন কার্যক্রমও চালান। কিন্তু প্রায় দুই মাস পর রহস্যজনকভাবে মামলার দায়িত্ব আবারও সাইমুম রেজা তালুকদারের কাছে ফিরে আসে। এই ঘন ঘন দায়িত্ব পরিবর্তনের বিষয়টি বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ফাঁস হওয়া অডিওতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রভাব খাটানোর ইঙ্গিত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রসিকিউশন সূত্রের দাবি, বিষয়টি তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের নজরে এলে সাইমুম রেজাকে ওই মামলা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বিচারিক স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই পরিস্থিতির মধ্যেই সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরীকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তার পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা দাবি করেন সাইমুম রেজা তালুকদার। ফাঁস হওয়া ফোনালাপের সূত্র ধরে জানা যায়, গত বছরের ডিসেম্বর মাসে আইনজীবী রিজওয়ানা ইউসূফের সঙ্গে এ বিষয়ে একাধিকবার কথা বলেন তিনি।
কথোপকথনের একপর্যায়ে তাকে এক কোটি টাকা ঘুষ দাবি করতে শোনা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ওই অর্থ কিস্তিতে পরিশোধের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে অডিওতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ফোনালাপে ঘুষ সংক্রান্ত মূল কথোপকথন
ফাঁস হওয়া ফোনালাপের একটি অংশ ইতোমধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ওই কথোপকথনে অর্থের পরিমাণ এবং সম্ভাব্য লেনদেন নিয়ে আলোচনা করতে শোনা যায় বলে দাবি করা হচ্ছে।
অডিওতে সাইমুম রেজা তালুকদারকে বলতে শোনা যায়, তিনি কি পুরো টাকার পরিমাণ উল্লেখ করবেন, নাকি আপাতত আংশিক কোনো অঙ্ক বলবেন। জবাবে আইনজীবী রিজওয়ানা ইউসূফ তাকে বলেন, মোট অঙ্কের কথাও বলতে পারেন, আবার আপাতত কোনো পরিমাণের কথাও জানাতে পারেন—তাতে কোনো অসুবিধা নেই।
এরপর কথোপকথনের একপর্যায়ে সাইমুম বলেন, যদি শেষ পর্যন্ত একটি সমাধান করা সম্ভব হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিষয়ে তার একটি প্রত্যাশা থাকবে—যা প্রায় এক কোটি টাকার সমপরিমাণ। সেই অর্থ কিস্তিতে পরিশোধ করা যেতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। উদাহরণ হিসেবে তিনি কয়েক দফায় ২০ লাখ করে পরিশোধের কথাও উল্লেখ করেন।
ফোনালাপের এই অংশে রিজওয়ানা ইউসূফকে মূলত সম্মতিসূচক শব্দের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাতে শোনা যায়। অডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে এবং ঘটনাটি জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
মামলা থেকে অব্যাহতি ও সাইমুমের প্রতিক্রিয়া
বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, ফাঁস হওয়া ফোনালাপটি তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের নজরে আসার পরই সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরীর মামলার দায়িত্ব থেকে সাইমুম রেজা তালুকদারকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে এ বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন সাইমুম নিজেই। তার বক্তব্য, কোনো প্রসিকিউটরকে কোন মামলায় রাখা হবে বা সরানো হবে—এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ এখতিয়ার চিফ প্রসিকিউটরের। তাই তাকে ওই মামলা থেকে সরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে ফাঁস হওয়া ফোনালাপের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন ধারণা তিনি মানতে চান না।
‘কোটি টাকা’ চেয়ে একাধিকবার ফোন করার অভিযোগও স্পষ্টভাবে নাকচ করেছেন তিনি। গণমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় সাইমুম রেজা বলেন, অভিযোগকারীদেরই এ বিষয়ে প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। তার দাবি, যদি বলা হয় তিনি একাধিকবার ফোন করেছেন, তবে সংশ্লিষ্ট কললিস্ট বা রেকর্ড সামনে আনতে হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এমন কোনো অর্থ লেনদেন বা ঘুষের বিষয়ে আলোচনা কখনোই হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, এই মামলায় বারবার প্রসিকিউটর পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র বা ফরমাল চার্জ গঠন না হওয়ার দায় প্রসিকিউশনের নয়, বরং তদন্ত সংস্থার। চট্টগ্রামের ওই ঘটনার সময় পুলিশের ভূমিকা কী ছিল, তা নিয়েও তদন্ত সংস্থাকেই জবাব দিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার প্রশ্ন, রাস্তায় মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনার পরও কেন পুলিশের ভূমিকা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে না।
এদিকে ঘটনাটিকে ঘিরে ওঠা বিতর্ক তদন্তে বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম পাঁচ সদস্যের একটি ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি’ গঠন করেছেন। এই কমিটি অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখবে বলে জানা গেছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এমন অভিযোগ বিচারব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাদের মতে, মানুষের আস্থা অটুট রাখতে কেবল প্রশাসনিক তদন্ত যথেষ্ট নয়। নিরপেক্ষ ও বহুপাক্ষিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।
দ্বিতীয় ফোনালাপ ও রাজনৈতিক হাতছানি
ফাঁস হওয়া দ্বিতীয় ফোনালাপেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ওই অডিওতে সাইমুম রেজা তালুকদারকে আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলতে শোনা যায়, তার দিক থেকে তিনি ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করবেন এবং পরিস্থিতি কীভাবে এগোয় তা দেখা হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালে বিরোধিতা থাকলেও সেটি পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি বর্তমান চিফ প্রসিকিউটরকে ‘যুক্তিসঙ্গত ও সাহসী’ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, ক্ষমতাসীন দলের সমর্থন থাকায় তিনি সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবেন। পাশাপাশি রাজনৈতিক মহলের কিছু ব্যক্তির কাছ থেকে সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন বলে অডিওতে শোনা যায়। সেখানে বিএনপির কিছু নেতার নামও উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ফাঁস হওয়া ওই ফোনালাপে অর্থ লেনদেনের সম্ভাব্য পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা করতে শোনা যায়। এক পর্যায়ে সাইমুম জানতে চান, তিনি কি অগ্রিম অর্থ নেবেন, নাকি কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর পুরো অর্থ গ্রহণ করাই ভালো হবে। উত্তরে অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, অর্থ সংক্রান্ত বিষয়টি তিনি দেখেন না এবং এ বিষয়ে সাইমুম ও রিজওয়ানা ইউসূফই ভালো জানেন।
জবাবে সাইমুম রেজা জানান, বিষয়টি নিয়ে রাতে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কয়েকজন প্রসিকিউটর এবং চিফ প্রসিকিউটরকে নিয়ে একসঙ্গে বসে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
ফোনালাপে অন্যান্য প্রসিকিউটরের নাম আসা নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন সাইমুম রেজা। তিনি বলেন, মামলাটি বিভিন্ন সময়ে একাধিক প্রসিকিউটরের হাতে ছিল, তাই তাদের নাম কথোপকথনে এসেছে। তবে তাদের সঙ্গে কোনো আর্থিক লেনদেন বা ঘুষ সংক্রান্ত আলোচনার প্রশ্নই ওঠে না বলে দাবি করেন তিনি।
নিজেকে সৎ দাবি করে আবেগাপ্লুত প্রতিক্রিয়াও দেন তিনি। তার ভাষ্য, চাইলে তার আর্থিক অবস্থা যাচাই করা যেতে পারে। তিনি দাবি করেন, ট্রাইব্যুনালে দায়িত্ব পালনকালে দীর্ঘ সময় একই পোশাক পরে কাজ করেছেন এবং তার কাছে উল্লেখযোগ্য কোনো অর্থসম্পদ নেই।
অভিযোগের বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেবেন কি না—এ প্রশ্নে সাইমুম রেজা স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি। তার বক্তব্য, তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলে সেটি এক ধরনের পরিস্থিতি, আর নিজে থেকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া অন্য বিষয়। বর্তমানে তিনি পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
অন্যদিকে ফজলে করিম চৌধুরীর আইনজীবী রিজওয়ানা ইউসূফ গণমাধ্যমকে জানান, বিষয়টি গণমাধ্যমে হঠাৎ সামনে এসেছে, যা তার কাছেও অপ্রত্যাশিত ছিল। তবে এত বড় একটি অভিযোগ জনসমক্ষে ওঠায় এর পেছনে কিছু না কিছু সত্যতা থাকতে পারে বলেও তার ধারণা।
মামলার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন সাইমুম রেজা তালুকদার। তার বক্তব্য, কোনো প্রসিকিউটরকে কোন মামলায় রাখা হবে বা সরানো হবে—এ সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে চিফ প্রসিকিউটরের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। তাই এ বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে তার কিছু বলার নেই বলে জানান তিনি।
সাইমুমের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট মামলার কাজ শেষ হলে দক্ষ প্রসিকিউটরদের অন্য মামলায় বদলি করা হয়। এটি প্রশাসনিকভাবে স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। তার দাবি, কোনো একক কারণের জন্য এমন পরিবর্তন হয় না; বিভিন্ন প্রশাসনিক বিবেচনায় এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে।
ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ড নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে প্রসিকিউটর মঈনুল করিম বলেন, রেকর্ডটির সত্যতা নিশ্চিত করতে হলে আগে কারিগরি যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। উপযুক্ত পরীক্ষা ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা কঠিন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রেকর্ডে কিছু প্রসিকিউটরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে—এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এতে তাদের কোনোভাবে জড়িত থাকার প্রশ্নই ওঠে না। তার ভাষ্য, তিনি একসময় এই মামলার দায়িত্বে ছিলেন এবং তদন্তের কাজে চট্টগ্রামেও গিয়েছিলেন। পরে তাকে অন্য কারণে সরিয়ে দেওয়া হলেও এর সুনির্দিষ্ট কারণ তার জানা নেই। তার ধারণা, প্রশাসনিক কোনো সিদ্ধান্তের ফলেই এ পরিবর্তন হতে পারে।
ফাঁস হওয়া অডিওতে শোনা কণ্ঠস্বরটি সাইমুম রেজার কি না—এ প্রশ্নে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা বলেন, প্রাথমিক কিছু কারিগরি পরীক্ষায় কণ্ঠস্বরের ফ্রিকোয়েন্সি ও কম্পন বিশ্লেষণ করে এটি পরিচিত বলে মনে হয়েছে। তবে যেহেতু বিষয়টি তদন্তাধীন, তাই আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটিই এ বিষয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেবে।
চিফ প্রসিকিউটরের প্রতিক্রিয়া
ঘুষের অভিযোগ প্রসঙ্গে বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, এ ধরনের অভিযোগ বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তার মতে, এমন অভিযোগ পুরো বিচারব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলে।
তিনি আরও বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই তিনি স্পষ্ট করেছেন—কোনো প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ন্যূনতম প্রমাণ পাওয়া গেলেও তা সহ্য করা হবে না। ট্রাইব্যুনালে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সবাইকে সব ধরনের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও লোভের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে সাবেক এমপি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর আইনজীবী রিজওয়ানা ইউসূফ এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেন, বিষয়টি হঠাৎ করেই গণমাধ্যমে সামনে এসেছে, যা তার কাছেও অপ্রত্যাশিত ছিল। তবে এত বড় একটি অভিযোগ জনসমক্ষে আসায় এর পেছনে কিছু না কিছু সত্যতা থাকতে পারে বলে তার ধারণা।
“ট্রাইব্যুনালে তদন্ত কমিটি ও শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রতিক্রিয়া
কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এই কমিটি গঠন করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কমিটির সদস্যরা ইতোমধ্যে তাদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেছেন।
গঠিত কমিটিতে রয়েছেন প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার, নবনিযুক্ত প্রসিকিউটর মার্জিনা রহমান মদিনা, মোহাম্মদ জহিরুল আমিন এবং ট্রাইব্যুনালের ল’ রিসার্চ অফিসার সিফাতুল্লাহ। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং ঘটনার পেছনের বাস্তবতা উদঘাটনই এই কমিটির মূল দায়িত্ব।
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তার মতে, ঘুষের মতো গুরুতর অভিযোগ পুরো বিচারপ্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং ট্রাইব্যুনালের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলে। তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই তিনি সতর্ক করেছিলেন—কোনো প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সামান্যতম প্রমাণ মিললেও তা বরদাশত করা হবে না। ট্রাইব্যুনালে দায়িত্ব পালন করতে হলে সবাইকে ব্যক্তিগত লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থাকতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ঘটনাটিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক। তার মতে, যাদের ওপর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার দায়িত্ব থাকে, তাদের বিরুদ্ধেই যখন ঘুষের অভিযোগ ওঠে, তখন পুরো বিচারব্যবস্থাই আস্থার সংকটে পড়ে।
তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিরা ব্যক্তিগত লাভের জন্য দায়িত্বের অপব্যবহার করছেন কি না, তা গভীর তদন্তের মাধ্যমে বের করা জরুরি। অন্যথায় সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা তৈরি হতে পারে যে প্রসিকিউশন কোনো বিশেষ পক্ষের হয়ে কাজ করছে। ড. তৌহিদুল হকের মতে, কেবল ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব তদন্তই যথেষ্ট নাও হতে পারে। বরং বিভিন্ন পেশার অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি বহুপাক্ষিক বা ‘মাল্টি-স্টেকহোল্ডার’ তদন্ত কমিটি গঠন করলে তদন্ত আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে।
তিনি আরও বলেন, আসামির জামিনের বিনিময়ে অর্থ দাবি করা শুধু দুর্নীতির বিষয় নয়, এটি আইনের চরম অবজ্ঞার শামিল। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত বা আহতদের ঘটনায় অভিযুক্তদের সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হলে তা আরও গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব তদন্ত যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, বিচারের প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পেশার অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি ‘মাল্টি-স্টেকহোল্ডার’ তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। এর উদ্দেশ্য হবে অভিযোগের যথাযথ ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান করা।
ড. তৌহিদুল সতর্ক করে বলেন, “বাংলাদেশে অনেক সময় সমস্যার সমাধানের জন্য নামকাওয়াস্তে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। আমরা সেই পুরনো সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি চাই না। বরং দ্রুততম সময়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা দরকার।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আইনাঙ্গনে কেবল আইনের প্রভাবই থাকবে—এটি নিশ্চিত করা জরুরি। যদি অন্য কোনো প্রভাব কাজ করে, তাহলে বুঝতে হবে সেখানে বড় সংকট রয়েছে। এই সংকট কাটাতে হলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দায়িত্বশীলদের কর্মকাণ্ড নিয়মিত তদারকির আওতায় রাখা প্রয়োজন। জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে সমস্ত বিতর্কের অবসান ঘটবে এবং আইনি সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।”

