মানুষ সবচেয়ে অসহায় হয় সাধারণত দুটি স্থানে—হাসপাতাল ও আদালতে। একটিতে জীবন রক্ষার প্রশ্ন, অন্যটিতে ন্যায়বিচারের। একটি আধুনিক রাষ্ট্রে এই দুটি প্রতিষ্ঠান নাগরিকের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
প্রকৃতপক্ষে কল্যাণ রাষ্ট্রের ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে তিনটি মূল ব্যবস্থার ওপর—শিক্ষা, চিকিৎসা এবং বিচার। এই তিনটির কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করলে রাষ্ট্রের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায়। সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট ও নাগরিকদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা নির্দেশ করে যে, এই প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই বাড়ছে।
আইনের একজন ছাত্র ও গবেষক হিসেবে লক্ষ্য করলাম, দেশের বিচার বিভাগে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ, জটিল এবং দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে প্রায়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিচারপ্রার্থীরা আদালতে অযৌক্তিক বিলম্ব, প্রশাসনিক জটিলতা ও দুর্নীতির কারণে হয়রানির শিকার হন। এছাড়া, আদালতের কর্মকর্তাদের অদক্ষতা, অবকাঠামোর ঘাটতি ও সহায়ক কর্মচারীর স্বল্পতা বিচার প্রক্রিয়াকে ধীর ও অকার্যকর করে তুলছে।
একটি বড় সংকট হলো বিচারকের অভাব। বর্তমানে প্রতিটি বিচারককে গড়ে তিন-চার হাজার মামলা পরিচালনা করতে হয়। মামলার এই ভীষণ চাপ বিচার প্রক্রিয়াকে স্থবির করে দেয়, ফলে নাগরিকদের মধ্যে হতাশা ও অনাস্থা সৃষ্টি হয়। বিলম্বিত ন্যায়বিচার বাস্তবে ন্যায়বিচারের অস্বীকারের সমতুল্য।
নাগরিকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিচারক ও সহায়ক কর্মচারীর সংখ্যা বৃদ্ধি অপরিহার্য। তবে কেবল জনবল বাড়ানো যথেষ্ট নয়। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করতে হলে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ই-জুডিশিয়ারি চালু করা সময়ের দাবি।
ই-জুডিশিয়ারির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কম্পিউটারভিত্তিক মামলার নথি ব্যবস্থাপনা। উন্নত দেশে এটি সংক্ষেপে সিসিএমএস (কম্পিউটারাইজড কোর্ট কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) নামে পরিচিত। এই ব্যবস্থায় আদালতের প্রতিটি মামলা, রায় ও আদেশ ডিজিটালি সংরক্ষণ ও পরিচালনা করা হয়। ফলে মামলার অগ্রগতি সহজে নজরে রাখা যায় এবং অযৌক্তিক বিলম্বের সুযোগ কমে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টাস্ক ইভেন্টস টাইমলাইন (টিইটি) ভিত্তিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে। কোনো মামলা অনলাইনে দাখিল করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ই-নথি তৈরি হয় এবং পরবর্তী পদক্ষেপের সময়সীমা বিচারপ্রার্থীর কাছে পৌঁছে যায়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন না হলে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা বিচারক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। প্রয়োজনে বিষয়টি সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত পৌঁছায়। এতে অযৌক্তিক বিলম্ব ও দুর্নীতির সুযোগ অনেকাংশে কমে।
ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনার আরও বড় সুবিধা হলো নথির সঠিকতা যাচাই। বর্তমানে আদালতের রায় বা নথি জাল, লুকানো বা গোপন করার সম্ভাবনা থাকে। সিসিএমএসে সব নথি ডিজিটালি সংরক্ষিত থাকায় সহজেই যাচাই ও তুলনা করা যায়। বসনিয়া হার্জেগোভিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের অধিকাংশ দেশ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিচার ব্যবস্থাকে কার্যকর ও দুর্নীতিমুক্ত করেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের সামনে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে—দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র কাঠামো। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিচার বিভাগের আধুনিকায়ন অপরিহার্য। এখন সময় এসেছে প্রতিটি আদালতে সম্পূর্ণ ই-জুডিশিয়ারি চালু করার। স্বচ্ছ, দক্ষ, স্বাধীন ও প্রযুক্তিনির্ভর বিচার ব্যবস্থা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সংকট কাটিয়ে নতুন দিগন্ত দেখাতে পারে।

