জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং এই পরিষদের অধিবেশন ডাকার দাবিতে ঈদের পর রাজপথে আসার আভাস মিলছে। গণভোটের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে এই পরিষদের অধিবেশন ডাকার সময়সীমা শেষ হচ্ছে আজ ১৫ মার্চ। অথচ এখন পর্যন্ত পরিষদই গঠিত হয়নি। ফলে পরিষদের অধিবেশন আহ্বানও অনিশ্চিত।
জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট জানিয়েছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা না হলে ঈদের পর তারা রাজপথে আন্দোলনে নামবেন। জোটের অংশীদার জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জানিয়েছে, তারা রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের দাবিও তুলবে এবং কঠোর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সরকারি দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি সংসদে আলোচনা হতে পারে। আইনমন্ত্রী বলেছেন, বিএনপির অবস্থান সংসদে প্রকাশ করা হবে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ও বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “যদিও জনগণ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন, সরকার এখনও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এটি দুর্ভাগ্যজনক এবং পরিণতি অমঙ্গলকর।”
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ চূড়ান্ত করা হয়। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এটি চূড়ান্ত করেছে। গত বছরের ১৩ অক্টোবর বিএনপি, জামায়াতসহ ২৫টি দল নোট অব ডিসেন্টসহ (আপত্তি) স্বাক্ষর করে। এরপর ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের দিনে, ১২ ফেব্রুয়ারি, গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। আদেশে বলা হয়, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে চলতি সংসদ একই সঙ্গে ১৮০ কার্যদিবস সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্ব পালন করবে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেবেন। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার কথা থাকলেও, ১৩ ফেব্রুয়ারি গেজেট প্রকাশের পর আজ ১৫ মার্চ সময়সীমা শেষ হচ্ছে।
১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদে শপথ গ্রহণে বিএনপির সংসদ সদস্যরা এমপি হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেননি। তাদের যুক্তি, সংবিধান সংস্কার পরিষদ সংবিধানে নেই। তবে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ৭৭ জন ও ইসলামী আন্দোলনের একজন এমপি পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন।
গত শনিবার জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ১১ দলীয় জোটের লিয়াজোঁ কমিটির জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, যদি সরকার ১৫ মার্চ পর্যন্ত অধিবেশন না ডাকে, তারা রাজপথে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ক্ষমতাসীন বিএনপি সংসদে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করতে চায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আলোচনা সংসদে হবে, কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে নয়। আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান আরও বলেন, “বিএনপির অবস্থান সংসদে জানা যাবে। সংসদ সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।”
এনসিপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের দাবিতেও ঈদের পর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এনসিপির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, “যদি সংস্কারের কোনো উদ্যোগই নেওয়া না হয়, গণভোটের রায় ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় আমরা রাজপথে নামব।”
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিলম্ব নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া মনে করেন, সমস্যা নেই। তিনি বলেন, পরিষদ গঠন হলে সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। অন্যদিকে, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, বিষয়টি আদালতে চলমান, তাই এখন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়।
তবে ড. শরীফ ভূঁইয়া আরেকবার উল্লেখ করেন, “সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের ক্ষমতা জনগণ দিয়েছে। এই ক্ষমতা প্রয়োগ না করলে তা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক।”

