ঈদকে সামনে রেখে দেশের সড়ক, মহাসড়ক ও শহরের বাসাবাড়িতে পাঁচ ধরনের অপরাধী সক্রিয় বলে পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। এসব অপরাধীর মধ্যে রয়েছে ছিনতাই, চুরি, অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি এবং ডাকাতি।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৪ মাসে দেশে ডাকাতির ঘটনা ৭৯৬টি এবং ছিনতাইসহ দস্যুতার মামলা দুই হাজার ১৩২টি দায়ের হয়েছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন যানবাহন মহাসড়কে ডাকাতির শিকার হচ্ছে। সংঘবদ্ধ ডাকাতচক্র সড়ক অবরোধ করে বা চালকদের ভয়ে যাত্রীদের নগদ টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী লুটে নিচ্ছে। কোথাও কোথাও মারধর এবং জিম্মির ঘটনাও ঘটছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মহাসড়কে এই ধরনের অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে রাতের পর্যাপ্ত টহলের অভাব, নির্জন ও অন্ধকার সড়ক, সংঘবদ্ধ চক্রের সক্রিয়তা এবং পুলিশ জনবল সংকট বড় কারণ।
পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, ঈদকে সামনে রেখে জেলা পুলিশ সুপারদের এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, বড় উৎসবের সময় মহাসড়কে ডাকাতি, শহরে ছিনতাই, বাসাবাড়িতে চুরি এবং লঞ্চ, ট্রেন ও যাত্রীবাহী বাসে অজ্ঞান ও মলম পার্টির সংখ্যা বাড়ে।
আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির সম্প্রতি সব জেলার পুলিশ সুপারদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি বৈঠক করে নির্দেশ দিয়েছেন, মহাসড়কে ডাকাতি ও ছিনতাই বন্ধ করতে হবে। বিশেষত হাইওয়ে পুলিশকে আরও তৎপর হতে বলা হয়েছে। সভায় পুলিশ সদর দপ্তরের অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন।
গোয়েন্দা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর আটটি ক্রাইম জোনে ৪৩২টি ছিনতাইপ্রবণ স্থান রয়েছে, যেখানে মোট ৯৭৯ জন ছিনতাইকারী সক্রিয়। মিরপুর ও তেজগাঁও অঞ্চলে ৩৮৬ জন, মতিঝিল ও ওয়ারী অঞ্চলে ২১২ জন, রমনা ও লালবাগ অঞ্চলে ২১৭ জন এবং উত্তরা ও গুলশান অঞ্চলে ১৫৪ জন ছিনতাইকারী সক্রিয়।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিনই ছিনতাই ও অজ্ঞান পার্টির শিকাররা চিকিৎসা নিতে আসছেন।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এখন ‘ডেঞ্জার স্পট’ হিসেবে পরিচিত। নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও ফেনীর বিভিন্ন অংশে ডাকাতির ঘটনা প্রায়ই ঘটে। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, নির্দিষ্ট স্থানে ডাকাতরা পরিকল্পিত হামলা চালাচ্ছে, বিশেষত বিদেশফেরত প্রবাসীদের গাড়ি এবং দামি প্রাইভেট কার লক্ষ্যবস্তু।
রাজধানী সংলগ্ন সড়কেও ঝুঁকি আছে। ঢাকা-আরিচা ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ভোর ও গভীর রাতে চলাচলকারী যানবাহন বেশি ঝুঁকিতে থাকে। পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানও ডাকাতদের টার্গেট। হাইওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি দেলোয়ার হোসেন মিঞা বলেন, অপরাধীরা সাধারণত রাতের বেলায় ছিনতাই ও ডাকাতি ঘটায়, তবে পুলিশ তৎপর রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে মাহফিল থেকে ফেরার পথে ইসলামী বক্তা মুফতি হাবিবুল্লাহ সিদ্দিকীর গাড়িতে ডাকাতি হয়। ডাকাতরা সহযোগী ও চালকসহ কয়েকজনকে কুপিয়ে জখম করে। পরে তিনটি মোবাইল ও নগদ ৪৫ হাজার টাকা লুটে নেয়।
আন্তর্জাতিক কোরআন তিলাওয়াত সংস্থা ইকরার সভাপতি আহমদ বিন ইউসুফ আজহারী জানান, মেঘনা এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সামনেই ডাকাতির ঘটনা ঘটে।
সম্প্রতি ফয়জুর রহমান নামের এক বৃদ্ধও জুরাইনের মুন্সিবাড়ী এলাকায় ভ্যান চালানোর সময় ছিনতাইয়ের শিকার হন।
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে ছিনতাইসহ দস্যুতার ১৬৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীতে ২৯টি, ঢাকা বিভাগের অন্যান্য জেলায় ৪২টি। মোটরসাইকেল ব্যবহার করে ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রায় ৬৫%, সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে ২০% এবং বাকী ১৫% ছদ্মবেশে সংঘটিত হচ্ছে।
গত পাঁচ বছরে ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২১ সালে এক হাজার ২৭৯টি, ২০২২ সালে এক হাজার ৫৩৪টি, ২০২৩ সালে এক হাজার ৫৪৬টি এবং ২০২৪ সালে এক হাজার ৯০২টি মামলা হয়েছে।

