ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই রাজধানীর পুরানা পল্টন এলাকায় গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ঢাকার ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও পরবর্তীতে মৃত্যু হয়।
এর কয়েক সপ্তাহ পরে, ২৮ জানুয়ারি বিকেলে শেরপুর-৩ আসনের ঝিনাইগাতীতে নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষে জামায়াত নেতা মাওলানা রেজাউল করিম গুরুতর আহত হন। রাতেই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
এই দুটি ঘটনায় ভোটের পরিবেশ ও সহিংসতার আশঙ্কা জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু নির্বাচন শুরুর আগেও সহিংসতা থামেনি। নির্বাচনের সময় পর্যন্ত ১০ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন আড়াই হাজারের বেশি মানুষ।
নির্বাচনের সহিংসতা ও অভিযোগের পরিসংখ্যান
নির্বাচন কমিশনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবারের সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত সহিংসতা, সংঘর্ষ এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের মোট অভিযোগ ৮৪২টি জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৩০ জেলায় নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনা ২০০-এর বেশি, এবং ২৪৮টি মামলা তদন্তাধীন। মামলায় মোট ৩৩৮ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) জানায়, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনি সহিংসতায় ১০ জন নিহত এবং প্রায় আড়াই হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। একই সময়ে তারা ৭০০টির বেশি সহিংস ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত করেছেন।
ভোটের দিনও অনিয়ম ও সংঘর্ষ থামেনি। দেশে ৩৯৩টি নির্বাচনী অনিয়মের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে কেন্দ্রভিত্তিক বিশৃঙ্খলা, সমর্থকদের সংঘর্ষ, ব্যালট স্টাফিং, পোলিং এজেন্ট অপসারণ এবং ভোটারদের বাধা দেওয়া উল্লেখযোগ্য। নির্বাচনের ফল ঘোষণা হলেও সহিংসতা থামেনি।
বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষে ৩ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে অন্তত ৩৫০টি অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, এসব ঘটনায় বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা জড়িত।
তদন্ত ও শাস্তির ব্যবস্থা
নির্বাচন কমিশনের ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি অ্যান্ড এডজুডিকেশন কমিটি জানায়, সহিংসতা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ৮৪২টি অভিযোগের মধ্যে বিভিন্ন ঘটনায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
- ২৩৮টি ঘটনায় সতর্কতা জারি
- ১২টি ঘটনায় বিতর্কিত কনটেন্ট অপসারণ
- ১৩টি ঘটনায় বেআইনি পোস্টার ও ব্যানার অপসারণ
- অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা ২৬৩টি
মোট অভিযোগের বিপরীতে মামলায় পরিণত হয়েছে ২৪৮টি, বাকি ৫৯৪টি অভিযোগ এখনো মামলার আওতায় আসেনি। এসব মামলায় ৩৩৮ জনকে আসামি করা হয়েছে, এবং ৩০৯ জনকে ১৮ লাখ টাকার বেশি জরিমানা করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে কারাদণ্ডও হয়েছে; ঢাকায় দুজনকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, আরও দুজনকে ২ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
অঞ্চলভিত্তিক হিসাব দেখালে, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। রাজশাহীতে ৫২টি মামলায় ৭৫ জন, চট্টগ্রামে ৪৬টি মামলায় ৫৩ জন আসামি হয়েছেন। খুলনা, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, রংপুর ও বরিশালেও একাধিক মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।
আলোচিত মামলাগুলোর পরিণতি: নির্বাচনের আগে ঘটে যাওয়া দুই বড় সহিংসতা মামলাও এখনো শেষ হয়নি।
- শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলা: মামলাটি পুনঃতদন্তাধীন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করছে। আদালত প্রতিবেদন দাখিলের সময় নির্ধারণ করেছে।
- শেরপুরের ঝিনাইগাতীর সংঘর্ষে মৃত মাওলানা রেজাউল করিমের ঘটনা: মামলাটি এখনো তদন্ত পর্যায়ে। পুলিশ সাক্ষ্যগ্রহণ ও সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে। নির্বাচনের আগে আলোচিত এই দুই মৃত্যুর বিচার এখনও সম্পন্ন হয়নি।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “নির্বাচনি অপরাধে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অভিযোগ পেলেই দ্রুত তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কমিশন মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে মামলা, জরিমানা বা প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।”
নির্বাচনী সহিংসতার ইতিহাস: বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সহিংসতা নতুন নয়।
- ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫৩০টি সহিংস ঘটনায় ১১৫ জন নিহত
- ২০১৮ সালে ৪১৪টি সহিংসতায় অন্তত ২২ জন নিহত
- ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ৫৩৪টি সহিংসতায় অন্তত ৬ জন নিহত
গবেষণায় দেখা গেছে, শেষ কয়েকটি সংসদ নির্বাচনে সহিংসতায় মোট ১৬৫ জন নিহত হয়েছেন। তবে বিচারের নজির কম। নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলী মন্তব্য করেন, “সহিংসতা কমাতে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযোগ তদন্ত ও শাস্তি ইতিবাচক, কিন্তু কার্যকর বিচার না হলে সহিংসতা কমবে না। দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ ও শক্তিশালী জবাবদিহি ব্যবস্থা থাকলে ভবিষ্যতে সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।”

