ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থীদের ঋণসংক্রান্ত তথ্য নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। নির্বাচনের আগে তাঁর নাম ঋণখেলাপির তালিকায় থাকলেও পরবর্তীতে তিনি শুধু নির্বাচিতই হননি, বর্তমানে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করছেন।
সিলেট সিটি করপোরেশন ও সিলেট সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল গত ২৯ ডিসেম্বর। এর পরদিন, ৩০ ডিসেম্বর, প্রার্থীদের ঋণসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে নির্বাচন কমিশনের কাছে দুটি পৃথক তালিকা পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি)।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিসেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এই প্রেক্ষাপটে সিআইবি প্রস্তুত করা তালিকাগুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়।
প্রথম তালিকায় সরাসরি ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ৮২ জনকে। দ্বিতীয় তালিকায় ছিল আরও ৩১ জনের নাম, যাঁরা উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এই দ্বিতীয় তালিকাতেই ছিলেন খন্দকার আবদুল মুক্তাদির অর্থাৎ আদালতের নির্দেশনার ভিত্তিতে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, জয়ী হন এবং পরে মন্ত্রিসভায় স্থান পান।
শুধু তিনি নন, ঋণখেলাপির তালিকায় থাকা আরও অনেকেই এবারের নির্বাচনে প্রার্থী হন। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আদালত শুরুতে ৩১ জনকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেন। তবে পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত রায়ে ঋণখেলাপি হিসেবে প্রমাণিত হওয়ায় কুমিল্লা-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থিতা বাতিল হয় এবং তিনি নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়েন।
অন্যদিকে, বাকি ৩০ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে সক্ষম হন। তাঁদের মধ্যে ৯ জন ইতোমধ্যে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে সংসদের অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে বিএনপির আরও দুই প্রার্থী বেসরকারি ফলাফলে জয়ী হলেও এখনো তাঁদের নামে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করেনি নির্বাচন কমিশন। তবে দ্রুতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
|
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ১২ নম্বর ধারা অনুযায়ী ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী আংশিক অর্থ পরিশোধ করে তাঁদের ঋণ ‘নিয়মিত’ দেখান। আবার কেউ কেউ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নামেন। এতে আইনের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নির্বাচনের আগে দেখা যায়, অনেক প্রার্থী সামান্য অর্থ জমা দিয়ে খেলাপি অবস্থান সাময়িকভাবে কাটিয়ে ওঠেন। এরপর আদালতের আদেশ নিয়ে তাঁরা প্রার্থী হন। কিন্তু নির্বাচনে পরাজিত হলে অনেকে আর ঋণ পরিশোধে আগ্রহী থাকেন না। বিপরীতে, নির্বাচিত হলে ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছান। সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁদের প্রভাব তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে আইন থাকলেও তা সব ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না বলে ধারণা তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত এমন কোনো নজির নেই, যেখানে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর শুধুমাত্র ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে কোনো সংসদ সদস্যের পদ বাতিল হয়েছে।
ঋণখেলাপি ও নির্বাচনী যোগ্যতা নিয়ে বিতর্কে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর-এর ঘটনা বিশেষভাবে আলোচিত। ২০১৪ সালের নির্বাচনে তিনি খেলাপি থাকা সত্ত্বেও আদালতের সাময়িক স্থগিতাদেশ নিয়ে অংশ নেন এবং জয়ী হন। তবে মামলার নিষ্পত্তি হতে হতে তাঁর সংসদ সদস্য হিসেবে পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। ফলে তাঁর পদ বাতিলের প্রশ্ন আর ওঠেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এই বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ নির্বাচনী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।
এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে হয়েছে আইনের বাধ্যবাধকতার কারণে। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা ঋণখেলাপি যাঁদের ছাড় দিয়েছি, মনে কষ্ট নিয়ে দিয়েছি। শুধু আইন তাঁদের পারমিট করেছে বিধায়।’
নির্বাচনের আগে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি জানতে চান, যাঁরা প্রকৃত অর্থে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্য নন, আদালতের স্থগিতাদেশ কি তাঁদের বিজয়ের পথ তৈরি করে দিচ্ছে না? তাঁর মতে, সামান্য অর্থ পরিশোধ করে ঋণ নিয়মিত দেখানো হলে তা নির্বাচনী সমীকরণকেই প্রভাবিত করে। সব মিলিয়ে, ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন এখনো জোরালোভাবেই রয়ে গেছে।
|
সিলেট-১: মুক্তাদিরের ঋণ কত
নির্বাচনী হলফনামায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ও তাঁর স্ত্রীর নামে একাধিক ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ রয়েছে। ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে তাঁর ব্যক্তিগত ঋণ ৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। পাশাপাশি তাঁর স্ত্রীর নামে ট্রাস্ট ব্যাংকে ৬২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা এবং প্রাইম ব্যাংকে ৯৮ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। এছাড়া ইসলামী ব্যাংকে ১৪ কোটি ৮৭ লাখ এবং আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকে ৯৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। এসব ঋণ ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়কালে পুনঃতফসিল করা হয়।
ঋণসংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ও সামনে আসে। এফএম ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেডকে ঋণখেলাপি হিসেবে তালিকাভুক্ত না করতে আদালতের স্থগিতাদেশ ছিল গত ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত। একইভাবে মাগনুম এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের ক্ষেত্রেও ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত এমন স্থগিতাদেশ বহাল ছিল। নির্বাচনের আগে আদালত নির্দেশ দিয়েছিলেন, সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই দুই প্রতিষ্ঠানের নাম ঋণখেলাপি হিসেবে সিআইবিতে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।
তবে গত ১৬ মার্চ মুঠোফোনে দেওয়া বক্তব্যে খন্দকার আবদুল মুক্তাদির দাবি করেন, নির্বাচনের আগেই তাঁর ঋণ নিয়মিত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এফএম ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেড এবং মাগনুম এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের সঙ্গে তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই, এমনকি তিনি এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডারও নন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি ভুলভাবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছিল এবং পরে আদালতের নজরে আনার পর তা নিষ্পত্তি হয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদ্যমান আইন থাকা সত্ত্বেও ঋণখেলাপিদের পুরোপুরি নির্বাচনের বাইরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর শুধুমাত্র ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে কোনো সংসদ সদস্যের পদ বাতিল হয়েছে—এমন উদাহরণ এখনো পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রাম-৬: গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী
চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী-এর ঋণসংক্রান্ত তথ্যও নির্বাচনের আগে আলোচনায় আসে। তাঁর নামে মোট ৬৭৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকার খেলাপি ঋণের তথ্য ছিল। তবে তাঁকে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করার ওপর আদালতের স্থগিতাদেশ বহাল ছিল গত ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, যা নির্বাচন শেষ হওয়ার ১১ দিন পর পর্যন্ত কার্যকর ছিল।
নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, বিভিন্ন ব্যাংকে তাঁর বড় অঙ্কের ঋণের তথ্য উঠে আসে। এর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকে ২৯৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা, সোনালী ব্যাংকে ২০১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে ১৬৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, ঢাকা ব্যাংকে ৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা এবং পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসে ৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে।
গত ১৭ মার্চ মুঠোফোনে দেওয়া বক্তব্যে গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী দাবি করেন, নির্বাচনের আগেই তাঁর সব ঋণ নিয়মিত ছিল। তাঁর ভাষায়, ব্যাংকে অর্থ জমা দেওয়ার পর তা অনুমোদনের জন্য পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হয়, যা সময়সাপেক্ষ। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় ঝুঁকি এড়াতে তিনি আগেভাগেই আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়েছিলেন।
আইন অনুযায়ী, কোনো মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সিআইবিতে ঋণখেলাপি হিসেবে দেখানো থেকে আদালত বিরত রাখতে পারেন। তবে এ ধরনের স্থগিতাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে বহাল থাকা উচিত নয়—এমন মত দিয়েছেন আইনজ্ঞরা।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে তা পরিশোধে ব্যর্থ ব্যক্তিদের সংসদ সদস্য হওয়া সীমিত হওয়া উচিত। তাঁর মতে, আইনপ্রণেতাদের ক্ষেত্রেই যদি ঋণ পরিশোধে অনিয়ম থাকে, তাহলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।
সার্বিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, আদালতের স্থগিতাদেশ ও ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ নিয়ে অনেক প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এতে আইনের প্রয়োগ ও বাস্তবতার মধ্যে একটি স্পষ্ট ফাঁক থেকে যাচ্ছে।

|
বগুড়া-১: কাজী রফিকুল ইসলাম
বগুড়া-১ আসনে ঋণখেলাপি ইস্যু নিয়েই আলোচনায় আসেন বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য কাজী রফিকুল ইসলাম। সোনাতলা ও সারিয়াকান্দি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে নির্বাচনের আগে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক স্থগিতাদেশ কার্যকর ছিল।
তাঁকে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করার ওপর আদালতের একটি স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হয় গত ২৫ জানুয়ারি। আরেকটি স্থগিতাদেশ শেষ হয়েছে ৭ মার্চ। এছাড়া আরও একটি স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে আগামী ২২ এপ্রিল। ফলে পুরো নির্বাচনকালজুড়ে তাঁর ঋণসংক্রান্ত বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল।
তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি দুটি ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধ না করায় কাজী রফিকুল ইসলাম অন্তত ৭৬৫ কোটি টাকার ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হন। এই কারণে শুরুতে তাঁর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা বাতিল হয়। তবে পরে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ পেয়ে তিনি প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পান।
গত ১৬ মার্চ মুঠোফোনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগেই বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুসারে ন্যূনতম অর্থ জমা দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করেছেন। তাঁর দাবি, এর ফলে স্থগিতাদেশের বিষয়টি এখন আর কার্যকর নয়।
এই ঘটনাও দেখায়, আদালতের স্থগিতাদেশ ও ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ নিয়ে অনেক প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। ফলে ঋণখেলাপি সংক্রান্ত আইনের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
কুমিল্লা-১০: মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া
কুমিল্লা-১০ আসনে প্রার্থিতা ঘিরে ঋণখেলাপি ইস্যুতে আলোচনায় আসেন বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া। নাঙ্গলকোট ও লালমাই উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে তাঁর নির্বাচনী যাত্রা শুরু থেকেই আইনি জটিলতায় পড়েছিল।
তাঁর মালিকানাধীন জমজম কার অ্যান্ড অটোমোবাইল প্রতিষ্ঠানের মালিক ও জামিনদাতা হিসেবে তিনি ঋণখেলাপি ছিলেন। একই সঙ্গে জমজম ট্রেডিং করপোরেশন লিমিটেডের পরিচালক হিসেবেও তাঁর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ ছিল। দুটি প্রতিষ্ঠানই ব্যাংক এশিয়া থেকে ঋণ নিয়েছিল, যা পরিশোধ না হওয়ায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়।
বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও ঋণখেলাপি এবং দলীয় প্রত্যয়নপত্র না থাকার কারণে গত ৩ জানুয়ারি বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল করেন। এরপর তিনি নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন। শুনানি শেষে গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনও তাঁর আপিল নামঞ্জুর করে এবং রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
পরে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রার্থিতা ফিরে পেতে ১৯ জানুয়ারি হাইকোর্টে রিট করেন মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া। তাঁর আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া সাংবাদিকদের জানান, দুটি কারণে তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল—ঋণখেলাপি থাকা এবং দলীয় প্রত্যয়নপত্র জমা না দেওয়া।
তবে তাঁর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, গত ১০ ডিসেম্বর এককালীন অর্থ পরিশোধের পর ২৯ ডিসেম্বরের আগেই ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়। ফলে তিনি আর ঋণখেলাপি নন এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা ফিরে পান।
এই ঘটনাপ্রবাহও দেখায়, ঋণ পুনঃতফসিল ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনেক প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে ঋণখেলাপি সংক্রান্ত বিধান বাস্তব প্রয়োগে কতটা কার্যকর—সে প্রশ্ন আবারও সামনে আসে।
বগুড়া-৫: গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ
বগুড়া-৫ (ধুনট ও শেরপুর) আসনে ঋণসংক্রান্ত তথ্য ঘিরে আলোচনায় আসেন বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ। তাঁর নির্বাচনী হলফনামায় ব্যক্তিগত ঋণের পরিমাণ তুলনামূলক কম দেখানো হলেও, কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে সেই তথ্যের বড় ধরনের অমিলের অভিযোগ ওঠে।
হলফনামা অনুযায়ী, নিজের নামে তিনি ২৭ লাখ টাকা এবং তাঁর স্ত্রী শাহনাজ সিরাজের নামে ৪ লাখ টাকা ঋণের তথ্য উল্লেখ করেন। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কেন্দ্রীয় তথ্য অনুসারে, তাঁর সংশ্লিষ্ট তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ১০৯ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে ক্যাব এক্সপ্রেস বিডির নামে ২৬ কোটি টাকা, ওয়ানটেল কমিউনিকেশনের নামে ৪৮ কোটি টাকা এবং এসআর হাইওয়ে সার্ভিসেসের নামে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ঋণ উল্লেখ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটির চেয়ারম্যান এবং একটির পরিচালক হিসেবে যুক্ত রয়েছেন তিনি।
এদিকে তাঁর স্ত্রী শাহনাজ সিরাজের মালিকানাধীন এসআর কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের নামেও বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের তথ্য সামনে আসে। নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় ৫১২ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে। পাশাপাশি একই প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রয়েছে প্রায় ৪১ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এসব ঋণ ও বকেয়া সংক্রান্ত চারটি মামলাও চলমান রয়েছে।
মামলাগুলোর মধ্যে একটি স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হয় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি এবং আরেকটি শেষ হয় ১৬ মার্চ। বাকি দুটি মামলার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিতাদেশ বহাল রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ তাঁর আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। তাঁর আইনজীবী সৈয়দা নাসরিন বলেন, ঋণগুলো নিয়মিত ছিল, তবে সিআইবি তথ্য হালনাগাদ হতে সময় লাগছিল। সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে আদালতের স্থগিতাদেশ নেওয়া হয়েছিল।
পুরো ঘটনাপ্রবাহে আবারও স্পষ্ট হয়, ঋণ পুনঃতফসিল, তথ্য হালনাগাদের বিলম্ব এবং আদালতের স্থগিতাদেশ—এই তিনের সমন্বয়ে অনেক প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে আইনের প্রয়োগ ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধানের বিষয়টি আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
ময়মনসিংহ-৫: মোহাম্মদ জাকির হোসেন
ময়মনসিংহ-৫ (মুক্তাগাছা) আসনে ঋণখেলাপি ইস্যু নিয়েই আলোচনায় আসেন ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জাকির হোসেন। নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর ব্যক্তিগত ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি ঋণের তথ্য উঠে আসে।
তথ্য অনুযায়ী, দুটি বেসরকারি ব্যাংকে তাঁর মোট প্রায় ৯৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ছিল। এর মধ্যে এনআরবি ব্যাংকে ৩২ কোটি টাকা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকে ৬৫ কোটি টাকা ঋণ অন্তর্ভুক্ত। এই ঋণসংক্রান্ত জটিলতার মধ্যেই তিনি নির্বাচনে অংশ নেন।
রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত নির্বাচনের আগেই তাঁকে ঋণখেলাপি হিসেবে দেখানো থেকে বিরত রাখতে স্থগিতাদেশ দেন, যার মেয়াদ আগামী ৬ জুন পর্যন্ত বহাল রয়েছে। ফলে নির্বাচনকালীন সময়ে তিনি আইনগতভাবে ঋণখেলাপি হিসেবে বিবেচিত হননি।
তবে গত ১৭ মার্চ দেওয়া বক্তব্যে মোহাম্মদ জাকির হোসেন দাবি করেন, নির্বাচনের আগেই তিনি সব ঋণ নিয়মিত করেছেন। তাঁর মতে, স্থগিতাদেশ থাকলেও বর্তমানে তিনি আর ঋণখেলাপি নন এবং আইন অনুযায়ী তাঁর প্রার্থিতায় কোনো বাধা নেই।
এই ঘটনাও প্রমাণ করে, আদালতের স্থগিতাদেশ ও ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ নিয়ে অনেক প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। ফলে ঋণখেলাপি সংক্রান্ত বিধানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম-৪: মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী
সীতাকুণ্ড ও পাহাড়তলী নিয়ে এই আসন। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর রিটার্নিং কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন ধানের শীষ প্রতীকে আসলাম চৌধুরী ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৪ ভোট পেয়েছেন। আর তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের আনোয়ার ছিদ্দিক চৌধুরী পেয়েছেন ৮৯ হাজার ২৬৮ ভোট। তবে মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর নামে কোনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর নিজের নামে, জামিনদার হিসেবে ও পরিচালক হিসেবে পাঁচ ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে নিজের ও অন্যান্য মিলে তাঁর ঋণ রয়েছে ৩৫৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা। জামিনদার হিসেবে তাঁর ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিচালক হিসেবে ঋণ ২৮৫ কোটি টাকা। সিআইবিতে তাঁর ঋণখেলাপি না দেখানোর ওপর প্রথমে গত ১৯ ও ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দেন আদালত। এ মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি নির্বাচনের আগেই আবার আদালত থেকে স্থগিতাদেশ পান।
নির্বাচনের দিন গত ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আসলাম চৌধুরীর বিষয়টি ঝুলে ছিল। সকালে নির্বাচন কমিশন আদেশ দেয় যে রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এবং আপিল বিভাগের দেওয়া আদেশ অনুযায়ী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন এবং তিনি তা করেছেনও। তবে আপিল চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফলাফল স্থগিত থাকবে বলে জানানো হয়। মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ প্রার্থীকে অনুরোধ করে বলেছিলেন, ‘মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম। ব্যাংকের টাকাটা কিন্তু দিয়ে দিয়েন।’
আসলাম চৌধুরী ১৬ মার্চ প্রথম আলোকে জানান, ‘ব্যাংকঋণের অর্থ আংশিক পরিশোধ করেছি। আর ঋণখেলাপি না দেখানোর জন্য আদালত থেকে নতুন করে স্থগিতাদেশ পেয়েছি আরও ছয় মাসের জন্য। সুবিধার দিক হচ্ছে, ব্যাংক মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। একটা প্রক্রিয়া চলছে। ফলে যেকোনো সময়ই এমপি হিসেবে প্রজ্ঞাপন জারি হবে বলে আশা করছি।’
চট্টগ্রাম-২: সারোয়ার আলমগীর
চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলা নিয়ে এই আসন। বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি থেকে সরোয়ার আলমগীর ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৫৪৫ ভোট পেয়েছেন। বিপরীতে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ নুরুল আমিন পেয়েছেন ৬২ হাজার ১৬০ ভোট। এর ফলাফলও স্থগিত রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি।
সারোয়ার আলমগীরের মালিকানাধীন কোম্পানির নাম এনএফজেড টেরি টেক্সটাইল। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় ২০১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ছিল এ কোম্পানির নামে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকায় বলা হয়েছে, ‘সিআইবিতে ঋণখেলাপি দেখানোর বিষয়ে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা বহাল আছে, যার মেয়াদ আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে।’
সারোয়ার আলমগীরের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগ গত ৩ ফেব্রুয়ারি বলেছেন, সারোয়ার আলমগীর নির্বাচন করতে পারবেন। কিন্তু ফলাফলটা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিন নির্বাচন কমিশনও একই আদেশ দেয়। নির্বাচন কমিশন ওই দিন বলেছিল, চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরোয়ার আলমগীরের নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশ স্থগিত থাকবে।
সারোয়ার আলমগীর ১৭ মার্চ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংকের ঋণ তাঁর নিয়মিত আছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাংকের কোনো মামলা নেই। তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ৫টি মামলা করা হয়েছিল জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে, যার ৪টিতে তারা হেরে গেছে। বাকি একটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়ার দিন আগামী ২৮ এপ্রিল। আশা করছি, নিষ্পত্তি হওয়ার পর প্রজ্ঞাপন জারি হবে।’
আছেন বিএনপির আরও ৩ সংসদ সদস্য
লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত কুমিল্লা-৯ আসনে বিএনপি থেকে বিজয়ী হয়েছেন মো. আবুল কালাম, কালিহাতী উপজেলা নিয়ে গঠিত টাঙ্গাইল-৪ আসনে বিএনপি থেকে লুৎফর রহমান ওরফে মতিন এবং শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার-৪ আসনে বিএনপি থেকে বিজয়ী হয়েছেন মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী।
আবুল কালামের ঋণ খেলাপি দেখানোর ওপর আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিতাদেশ রয়েছে আদালতের। লুৎফর রহমানের স্থগিতাদেশ রয়েছে আগামী ২৪ মে পর্যন্ত। আর মুজিবুর রহমান চৌধুরীর ব্যাপারেও আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে ঋণখেলাপি দেখানো যাবে না মর্মে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে।
ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে জাতীয় পার্টির (একাংশ) নেতা ও কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের প্রার্থী মুজিবুল হক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মুজিবুর রহমান শামীম, জাতীয় পার্টির প্রার্থী গোলাম সরোয়ার, এলডিপির মো. হাসান ইমাম ও জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল হকসহ অনেকেই নির্বাচন করতে পারেননি।
পুরো চিত্র তুলে ধরে গত ১৬ মার্চ প্রথম আলোর পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয় সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিকের কাছে। তিনি বলেন, সমাজে কেউ কেউ ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি আছেন, তবে ইচ্ছাকৃতদের ধরা মুশকিল। কেউ কেউ আবার ব্যবসা করতে না পারার কারণেও ঋণখেলাপি হন। কেউ আবার অন্যের জামিনদার হয়ে নির্বাচন করায় অযোগ্য হয়ে পড়েন। ফলে আদালতে গিয়ে তাঁরা নিজেদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে পারলে আদালত সুবিচার করেন এবং স্থগিতাদেশ দেন। এবারও তা-ই হয়েছে।
শাহদীন মালিক বলেন, ‘চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সিআইবিতে খেলাপি দেখানো যাবে না—এমন আদেশ আদালত দিতেই পারেন। তবে সময়টা সীমাহীন না হওয়াই ভালো। আমি চাই, ব্যাংক থেকে বিশাল অঙ্কের টাকা নিয়ে তা ফেরত দিতে না পারা ব্যক্তিরা যত কম এমপি হতে পারেন। আইনপ্রণেতারা যদি টাকা নিয়ে ফেরত না দেন, তাতে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়, বিনিয়োগ কম হয়, কর্মসংস্থান কম হয় এবং অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে।’
২০১৮ সালেও মনোনয়ন বাতিল
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ঋণ খেলাপি হওয়ার কারণে কোনো কোনো প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছিল, যাঁরা এবার জয়ী হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আসলাম চৌধুরী ও গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী। আসলাম চৌধুরী ২০১৮ সালে ভোটের আগের দিন আদালতের নির্দেশে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তখন তাঁর প্রধান নির্বাচনী এজেন্টের দায়িত্ব পালনকারী মোহাম্মদ মোরসালিন। দেখা যাচ্ছে, ধারাবাহিকভাবে ঋণখেলাপি থাকা অনেকে সামান্য কিছু টাকা ব্যাংকে দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করে আদালতের মাধ্যমে নির্বাচন করার সুযোগ পাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ঋণখেলাপিদের সংসদে আসার সুযোগ করে দেওয়াটা খুবই খারাপ সিদ্ধান্ত হয়েছে। যত দূর জানি, সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর তা ঠেকানোর চেষ্টা করেও পারেননি। ফলে ২ শতাংশ নগদ জমার সুযোগটি নিয়েই একশ্রেণির ব্যবসায়ী আজ সংসদ সদস্য হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ঋণখেলাপিদের প্রতি নতুন সরকার ও নতুন গভর্নরের যে দৃষ্টিভঙ্গি, তা ব্যাংক খাত তথা অর্থনীতির জন্য ভালো মনে হচ্ছে না। সূত্র: প্রথম আলো

