বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নির্দেশনায় দেশে ধারাবাহিকভাবে নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটছে এমন অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জনমনে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক তদন্তেও আন্ডারওয়ার্ল্ডের সরাসরি সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দেশের বাইরে অবস্থান করেও এসব ‘গডফাদার’ প্রযুক্তি ও সংগঠিত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে স্থানীয় ক্যাডারদের নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের মূল লক্ষ্য এলাকা দখল, আধিপত্য বিস্তার এবং আর্থিক প্রভাব প্রতিষ্ঠা। এতে অপরাধচক্রগুলো আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
দীর্ঘদিন পলাতক থাকা এবং কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠার পর থেকেই অপরাধ পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। পুরোনো দ্বন্দ্ব, প্রতিশোধ এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই নতুন করে সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। সংঘবদ্ধ চক্রগুলোর মধ্যে বিরোধ এখন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পরিণত হচ্ছে।
সরকার পরিবর্তনের পর কিলার আব্বাস, সুইডেন আসলাম, পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ইমন, টিটন ও ফ্রিডম রাসুসহ কয়েকজন কুখ্যাত সন্ত্রাসীর মুক্তি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একই সময়ে মোল্লা মাসুদ ও টোকাই সাগরের মতো পলাতক সন্ত্রাসীরাও দেশে ফিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দেশে ফিরেই তারা পুরোনো নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন, এলাকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং চাঁদাবাজি শুরু করেছে। এতে বাধা দিলে সংঘাত দ্রুত সহিংস রূপ নিচ্ছে।
পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এখন শুধু রাজনৈতিক কর্মীরাই নয়, ব্যবসায়ীরাও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, অবৈধ অস্ত্রের অবাধ ব্যবহার এবং সংগঠিত অপরাধচক্রের পুনরুত্থান সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কিবরিয়া হত্যা: বিদেশ থেকে পাওয়া আদেশ
রাজধানীর পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডে উঠে এসেছে নতুন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও র্যাব সূত্র বলছে, এই হত্যার নেপথ্যে ছিল বিদেশে অবস্থানরত দুই ভাইয়ের নির্দেশনা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে অবস্থানরত মশিউর রহমান মশি এবং মালয়েশিয়ায় থাকা তার ভাই মফিজুর রহমান ওরফে মামুন দূর থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেন। তারা প্রযুক্তি ও নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে স্থানীয় সহযোগীদের দিয়ে পুরো ‘অপারেশন’ পরিচালনা করেন।
তদন্তে জানা যায়, গোলাম কিবরিয়ার মাধ্যমে এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানো এবং দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যাচ্ছিল। পাশাপাশি শীর্ষ সন্ত্রাসী মশিউর রহমান মশির দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণেও বাধা সৃষ্টি হচ্ছিল। এসব কারণেই পরিকল্পিতভাবে তাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ উদ্দেশ্যে কয়েকজন ভাড়াটে শুটার নিয়োগ করা হয়। র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া রাশেদ ও জাহাঙ্গীর সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় বলে জানা গেছে। তাদের সহযোগিতায় আরও চার থেকে পাঁচজন সক্রিয় ছিল। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে একটি বিদেশি রিভলভার ও গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
হত্যার পর ভুক্তভোগীর স্ত্রী সাবিহা আক্তার দীনা পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় উল্লেখ করা পাঁচজনের সবাই বিদেশে পলাতক মশিউর ও মামুনের অনুসারী এমন তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে। এই ঘটনায় রাজধানীতে সংগঠিত অপরাধচক্রের বিদেশভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মুসাব্বির হত্যাকাণ্ড:
চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি রাজধানীর তেজগাঁওয়ের তেজতুরি বাজার এলাকায় সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বির। দিনের আলোতেই সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ায়।
ঘটনার পর প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ ধারণা করছে, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও দখলবাজিকে কেন্দ্র করেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। স্থানীয় প্রভাব বিস্তারকে ঘিরে বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ঘটনায় তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে চার সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া মূল শুটারদের পরিচয় শনাক্তে এখনও কাজ চলছে। তদন্তকারীরা বলছেন, ঘটনায় জড়িত অন্যদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এই হত্যাকাণ্ড রাজধানীতে সংঘবদ্ধ অপরাধ ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতার প্রবণতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বিএনপি নেতা সাধন হত্যাকাণ্ড
গত বছরের ২৫ মে রাজধানীর মধ্যবাড্ডার গুদারাঘাট এলাকায় বিএনপির গুলশান থানা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক কামরুল আহসান সাধন (৫৪) গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তদন্তে উঠে এসেছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের পাশাপাশি ইন্টারনেট ও ক্যাবল ব্যবসা, স্থানীয় আধিপত্য এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের ‘গডফাদারদের’ সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে।
এছাড়া, ২৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পান্থপথ জুতার মার্কেটের সামনে চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপির সহ-সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমানকেও গুলিবিদ্ধ করা হয়। এসব ঘটনায় দেখা যায়, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধ জগতের হাতিয়ার হিসেবে স্থানীয় দ্বন্দ্বগুলো সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বর্তমানে এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত মূল অপহরণকারী ও শুটারদের শনাক্ত এবং গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
আন্ডারওয়ার্ল্ড দ্বন্দ্বে তীব্র হচ্ছে সহিংসতা
গত বছরের ১১ নভেম্বর পুরান ঢাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারেক সাইদ মামুনকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। ঘটনার পেছনে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ভেতরকার দ্বন্দ্বের প্রভাব স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। তদন্তে জানা যায়, ঘনিষ্ঠতার আড়ালে ফাঁদ পেতে তাকে ডেকে এনে হত্যা করা হয়েছিল। সন্ত্রাসী বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধু সানজিদুল ইসলাম ইমনের দ্বন্দ্বই হত্যার মূল কারণ ছিল।
পলাতক সন্ত্রাসী ও আইনি জটিলতা
২০০১ সালে প্রশাসনের তৈরি ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তালিকার ২৩ জনের মধ্যে এখনও ১৩ জন দেশের বাইরে পলাতক। যদিও অনেকের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি আছে, বিভিন্ন দেশের আইনি জটিলতা ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার কারণে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা সবসময় সম্ভব হচ্ছে না। এই বিষয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টারের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম সাহাদাত হোসাইন জানান, বন্দী বিনিময় চুক্তি থাকলেও প্রত্যর্পণ সবসময় সহজ নয়। তবে প্রশাসনের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।
রাজধানী ও সারাদেশে বাড়ছে হত্যাকাণ্ড
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীসহ সারাদেশে হত্যার সংখ্যা বাড়া সমাজের গভীর সংকটকে প্রতিফলিত করছে। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫০টি হত্যাকাণ্ড জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “আধিপত্য বিস্তার, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ এবং দুর্বল আইন প্রয়োগ—এই তিন কারণে খুন ও সহিংসতা বাড়ছে। আইন শৃঙ্খলার কঠোর প্রয়োগ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।”
বিদেশে বসে পরিচালিত অপরাধচক্র, দেশে সক্রিয় ক্যাডার নেটওয়ার্ক এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সমন্বয়ে বাংলাদেশে একটি জটিল অপরাধ বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ড. হকের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত, সমন্বিত এবং কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। সূত্র: আরটিএনএন

